যুগে যুগে ঈমান মুসলিম জাতিকে যেভাবে সম্মানিত করেছে

– বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের দ্বিনি ও দাওয়াতি কার্যক্রম চোখে পড়ে। বহু প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন মুসলিম বিশ্বের পুনর্জাগরণের জন্য কাজ করছে। ইসলামী জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রচার বিষয়ে অসংখ্য বই-পুস্তক, সংবাদপত্র ও প্র’বন্ধ প্রকাশ করা হচ্ছে। তাৎপর্যপূর্ণ শিরোনামে সভা-সেমিনার হচ্ছে। কিন্তু যে ফলাফল লাভের কথা ছিল এবং মুসলিম বিশ্বে যে জাগরণ সৃষ্টির প্রত্যাশা করা হয় তা হচ্ছে না। কিন্তু

কেন? বাহ্যিক উপায়-উ’পকরণের কোনো অভাব নেই, সহায়-সম্পদের কমতি নেই। মুসলিম বিশ্বের বহু দেশের জীবনযাত্রার মান এমন যা শুধু শিল্পোন্নত কোনো দেশেই সম্ভব। মুসলিম জাতি এখন বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিঃসঙ্গ ও আ’শ্রয়হীনও নয়। তারা যথেষ্ট সামরিক শক্তিও অর্জন করেছে। মুসলিম সমাজে ধর্মীয় অনুপ্রেরণাও বিদ্যমান, যা প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বোঝা যায়। জ্ঞান-

বিজ্ঞান ও আধু’নিকতায়ও কতক মুসলিম দেশ এগিয়ে গেছে। আমরা যদি চিন্তা করি এবং পর্যালোচনা করি যে কোন ক্ষেত্রে দুর্বলতা আছে, কেন সব উপকরণ থাকার পরও আমরা উপকৃত হতে পারছি না। শত্রুর শত্রুতা এবং ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্রের কথা বলা হলে, বলতে হবে তা সর্বযুগেই ছিল। সর্বযুগেই মুসলিম উম্মাহ এমন সংকটের মোকাবেলা করে এসেছে; বরং এর চেয়ে অনেক বড় সংকট ও পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছে।

ইসলামের পথে, ইসলামের অনুসারী হওয়ায় মুসলমানের পথে সব সময় কাঁটা বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে, রক্তের স্রোত বয়ে গেছে। প্রশ্ন হলো, উপায়-উপকরণের অভাব, শক্তি ও সামর্থ্যের ঘাটতি সত্ত্বেও কিভাবে বিগত যুগের মুসলিমরা বিজয়ী হয়েছিল এবং শ’ত্রুদের পরাজিত করেছিল। আর কেন আজ মুসলিমরা সংকট কাটিয়ে উঠতে পারছে না। নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ হলে স্পষ্ট হবে যে ঈমান ও বি’শ্বাসের ঘাটতিই বর্তমানে মুসলমানের

সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, যা উল্লিখিত সব শক্তির চেয়ে বেশি উপকারী, যা মুসলিম জাতিকে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। নিঃশর্ত ঈমান, আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস এমন অমূল্য অর্জন, যা মুসলিম জাতিকে এমন সময় বিশ্ব নেতৃত্বে সমাসীন করেছিল যখন তারা সং’খ্যায় খুব কম ছিল। এতই কম ছিল যে তাদের হাতে গোনা সম্ভব ছিল। তখন তারা যে বিপদের মুখোমুখি হয়েছিল তার সঠিক চিত্র পবিত্র কোরআনে চিত্রিত হয়েছে এভাবে—‘তোমরা ভয় করছিলে যে মানুষ তোমাদের ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে।’ কিন্তু তাদের ঈমান ও বিশ্বাস ছিল সুদৃঢ় এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে ছিল উন্নত। তাদের এই উচ্চ চারিত্রিক ও নৈতিক বৈশিষ্ট্য এবং

আকাশছোঁয়া ব্যক্তিত্ববোধ ছিল তাদের অগ্রগামী বাহিনী—মানুষের হৃদয় জয় করে নিত। তারা ঢাল-তলোয়ার ও তীর-কামান ব্যবহারের আগেই তাদের দৃষ্টি মানুষের অন্তর ছেদ করে ফেলত, ফলে তারা মুসলিমদের প্রতিরোধ করার চিন্তা থেকে সরে এসে তাদের স্বাগত জানাত। কমপক্ষে তাদের অন্তরে অজানা ভয় চেপে বসত ফলে তাদের প্রতিরোধ চেষ্টা ভেঙে যেত বালুর বাঁধের মতো। আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, যখন হিরাক্লিয়াস সংবাদ পেল যে মুসলিম বাহিনী শামে আক্রমণ করেছে, তখন শামবাসী তাকে বলল, এই লোকগুলো একটি নতুন ধর্মের অনুসারী।

কেউ তাদের প্রতিরোধ করতে পারছে না। আপনি আমাদের পরামর্শ মেনে নিন এবং তাদের সঙ্গে শামের অর্ধেক কর তাদেরকে দেওয়ার শর্তে সমঝোতা করে নিন। যদি আপনি আমাদের পরামর্শ মেনে নেন, তবে রোমের পাহাড়গুলো আপনার অধীনে থাকবে। আর যদি তা মেনে না নেন, তবে তারা আপনার কাছ থেকে শামও ছিনিয়ে নেবে এবং রোমের পাহাড়গুলো কেড়ে নেবে। ‘নাহাওয়ান্দে’র ঘটনার সময় ইরাকে সৈন্য প্রেরণের আগে ওমর (রা.) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। তখন আলী (রা.) বলেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন, ইসলামে আল্লাহর সাহায্য লাভ করা

ও লাভ না করার ভিত্তি সংখ্যা কম-বেশি হওয়ার ওপর নির্ভর করে না। এটা আল্লাহর দ্বিন, আল্লাহ এই দ্বিনকে বিজয়ী করেছেন; এটা তাঁর বাহিনী, তিনি এই বাহিনীকে বিজয়ী করেছেন এবং ফেরেশতাদের মাধ্যমে সাহায্য করেছেন। এমনকি মহান আল্লাহ আমাদের অঙ্গীকার করেছেন যে তিনি তার বিশেষ বাহিনীর মাধ্যমে আমাদের বিজয়ী করবেন।’ এই আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি

করে তারা নিজেদের ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিতেন এবং বিস্ময়কর কাজ সম্পন্ন করতেন, যা স্বাভাবিক কর্মধারার সম্পূর্ণ বাইরে। আল্লাহর ওপর নির্ভর করে তারা নিজেদের ঘোড়া দজ’লা নদীর ওপর চালিয়ে দেয় এবং এমনভাবে তারা পার হয়ে যায়, যেভাবে ভূমিতে ঘোড়া চালিয়ে যায়। এই বিশ্বাস ও আস্থার জোরে তারা অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের অধিকারী হয়।

তারা কখনো সংখ্যাধিক্য অর্জনের পেছনে পড়েনি। তারা ঈমানি শক্তি নিয়ে লড়াই করে। তাদের বিজয় ও অগ্রযাত্রা অর্জিত হয়। আহমদ ইবনে মারওয়ান মালেকির বর্ণনা হলো, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সাহাবিদের সামনে শত্রু বাহিনী এতটুকু সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পারত না, যতটুকু সময়ের মধ্যে উটের দুধ বের হয়। আন্তাকিয়া থেকে যখন হিরাক্লিয়াসের বাহিনী পরাজিত হয়ে ফেরে, তখন তাদের বলা হলো মুসলিমদের ব্যাপারে কিছু বোলো। তখন তাদের বলা হয়—সংখ্যায় কারা বেশি ছিল? তাহলে কেন তোমরা পরাজিত হলে?

তারা উত্তর দিল, তারা রাতে নামাজ আদায় করে, দিনে রোজা রাখে, তারা যে অঙ্গীকার করে সে অঙ্গীকার পূরণ করে, ভালো কাজের নির্দেশ এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়, ন্যায়-ইনসাফের সঙ্গে কাজ করে। বিপরীতে আমরা মদ পান করি, ব্যভিচারে লিপ্ত থাকি, হারাম কাজে লিপ্ত হই, অঙ্গীকার পূর্ণ করি না, ক্রোধ হলে অবিচার করি, আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এমন কাজের নির্দেশ দিই, আল্লাহ সন্তুষ্ট হন এমন কাজ থেকে মানুষকে বাধা দিই এবং বিশৃঙ্খলা

সৃষ্টি করি। তাদের বিবরণ শুনে হিরাক্লিয়াস বলল—হ্যাঁ, তোমরা ঠিক বলেছ। সুতরাং আমরা যদি সত্যিকার বিজয়, সাফল্য ও অগ্রগতি চাই তবে আমাদের ঈমান ও বিশ্বাসের জায়গাটি সুদৃঢ় করতে হবে। তাহলে আমরা সামান্য উপায়-উপকরণ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারব। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন। তামিরে হায়াত থেকে মো. আবদুল মজিদ মোল্লার ভাষান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *