রামুতে ভোট গণনা না করেই মেম্বার পদে জয়ী ঘোষণার অভিযোগ

কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড ঘোনারপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট গণনা না করেই অনুমান নির্ভর ফলাফল ঘোষণা করেছে বলে অভিযোগ এনেছে ভুক্তভোগী একাধিক মেম্বার পদপ্রার্থী ও তাদের পোলিং এজেন্ট। এমনকি রেজাল্ট শীটে শুধুমাত্র বিজয়ী ঘোষিত প্রার্থীর পোলিং এজেন্টের সাক্ষর নিয়ে বাকী আরও ৫প্রার্থীর পোলিং এজেন্টের সাক্ষর না নিয়েই উপজেলায় উক্ত কেন্দ্রের লিখিত ফলাফল হস্তান্তর করার গুরুত্বর অভিযোগ উঠেছে প্রিজাইডিং অফিসার স্বঙ্ঘদেশ বড়ুয়ার বিরুদ্ধে।

শুধু তাই নয়- গুরুত্বপূর্ণ ১৬টি ভোটের কোনো ধরণের হিসাব না দিয়েই একজন পছন্দের প্রার্থীকে ১১ ভোটে এগিয়ে রয়েছে এমনটি দেখিয়ে বিজয়ী ঘোষণা করে চলে যান। সেই সাথে অভিযোগকারী মেম্বার পদপ্রার্থী শামসুল হককে ওই কথিত বিজয়ীর নিকটতম প্রতিদ্বন্ধী দেখানো হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়- কেন্দ্রে চেয়ারম্যান ও মহিলা ভোটের ক্ষেত্রে মোট ভোট, প্রাপ্ত ভোট, বাতিল ভোট, মোট উপস্থিতি হিসেব করে অনুপস্থিত ভোটারের সংখ্যা যথাযথ ভাবে দেখানো হলেও পুরুষ ভোটের ক্ষেত্রে প্রাপ্ত, বাতিল, মোট উপস্থিতি সংখ্যা হিসেবে রয়েছে ব্যাপক গরমিল। এবং অনুপস্থিত ভোটারের ক্ষেত্রেও বসানো হয়েছে এক ভুতুড়ে সংখ্যা। যা কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে ১৬টি ভোটের কোনো হিসেব না মিলিয়েই ফলাফল ঘোষণা করে প্রিজাইডিং অফিসার সঙ্ঘদেশ বড়ুয়া।

এঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নির্বাচনের দিন ১১ নভেম্বর বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে রামু উপজেলা কার্যালয় ও নির্বাচনী কর্মকর্তার কার্যালয় ঘেরাও করে। তখন নির্বাচনী কর্মকর্তা মাহফুজুল ইসলামও কোনো আইনী সুরাহা না দিয়ে বিক্ষোভকারীদের ফিরে যেতে বলেন। উল্টো হুমকি দিয়ে পারলে মামলা করতে বলেন। এসময় নিরুপায় হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীরা সেখানে অবস্থানরত নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ বিভাগের প্রধানের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আমিন আল পারভেজকে বিষয়টি জানান। তিনি রামু নির্বাচন কর্মকর্তা বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন।

পরামর্শ অনুযায়ী তাৎক্ষণিক লিখিত অভিযোগ দিতে গেলে সেটিও গ্রহণ করেনি রামু নির্বাচনী কর্মকর্তা মাহফুজুল। পরে ওই অভিযোগটি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বরাবর দিলে তিনি পরদিন ১২ নভেম্বর শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে রামু উপজেলা নির্বাচনী কর্মকর্তার সাথে দেখা করে সর্বশেষ পরিস্থিতি জেনে নিতে বলেন। কিন্তু ওইদিনও ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীরা তার সাথে যোগযোগ করে প্রতিকার পেতে ব্যর্থ হন। পূর্বেকার মতো ওই দিনও তিনি সংক্ষুব্ধ পক্ষকে মামলা করার পরমার্শ দেন।

৫নং ওয়ার্ডে বৈদ্যুতিক পাখা প্রতীকে প্রবীণ মেম্বার পদপ্রার্থী শামসুল হক জানান- তিনি ওয়ার্ডে সর্বাধিক ভোট পেয়েছেন। কিন্তু প্রিজাইডিং অফিসার সঙ্ঘদেশ বড়ুয়া মোটা অংকের উৎকোচ গ্রহণ করে ভোট গণনা না করেই রহস্যজনক ভাবে অনুমান নির্ভর একজন প্রার্থীকে জয়ী ঘোষণা করে তড়িঘড়ি করে চলে যান। পোলিং এজেন্টদের শত অনুরোধ সত্বেও ওই অফিসার তাদের সামনে ভোট গণনা করেননি। প্রিজাইডিং অফিসারের এমন কান্ডে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে আরও বলেন- এই কেন্দ্রে হয় ভোট পূন গণনা করতে হবে নতুবা পূন ভোটের আয়োজন করতে হবে। তিনি এমন অন্যায়ের প্রতিকার চেয়ে আইনের দ্বারস্থ হবেন বলেও জানান।

শামসুল হকের পোলিং এজেন্ট শহীদুল ইসলাম বাপ্পীও প্রায় একই দাবী করেন। তিনি বলেন- কেন্দ্রে সেদিন আরও পাঁচজন প্রার্থীর এজেন্ট ছিলো। কিন্তু প্রিজাইডিং অফিসার শুধুমাত্র জয়ী ঘোষিত প্রার্থীর এজেন্টের সাক্ষর নিয়ে বাকী আর কারও সাক্ষর না নিয়ে চলে যান।

অভিযোগ করে তিনি আরও বলেন- সেদিন কেন্দ্রে বিজয়ী ঘোষিত প্রার্থীর এজেন্ট ছাড়া আর কারও মোবাইল কেন্দ্রে ঢুকাতে দেওয়া হয়নি। ভোট গণনা কেন্দ্রের ভেতরে ওই একজন ছাড়া বাকী সব প্রার্থীর এজেন্টদের মোবাইল জব্দ করে রেখে দেওয়া হয়। এছাড়াও রেজাল্ট শীটে ভুল তথ্য দিয়ে উপজেলায় সাবমিট করা হয়েছে। ভোটার অনুপস্থিতি সংখ্যা চেয়ারম্যান ও মহিলা মেম্বারের ফলাফল পাতায় এক হলেও পুরুষ মেম্বারদের রেজাল্ট শীটে ভিন্ন দেখানো হয়েছে। এছাড়াও অবৈধ ও বাতিল ভোটের স্থলে ঘষা মাঝা করে সংখ্যাটি নথিভূক্ত করা হয়ছে। চেয়ারম্যান, মহিলা মেম্বার ও পুরুষ মেম্বারের তিনটি শীটের প্রাপ্ত ভোট, বাতিল ভোট এবং অনুপস্থিতির সংখ্যা যোগ বিয়োগ করে মোট ১৬টি ভোটের হদিস পাওয়া যায়নি।

একই কেন্দ্রে ৪/৫/৬ নং ওয়ার্ডের মহিলা প্রার্থী মনোয়ারা বেগম তথা সূর্যমূখী প্রতীকের পোলিং এজেন্ট ছিলেন নাজমুল হুদা মানিক। তিনিও এঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দাবী করে জানান- প্রিজাইডিং অফিসারকে একাধিক প্রার্থীর এজেন্ট শত অনুরোধ জানিয়েছে ভোট গণনা করতে। কিন্তু অফিসার ভোট গণনা করা হয়ে গেছে দাবী করে নানা ভাবে হুমকি ধমকি দিয়ে কোনো ভাবেই আর ভোট গণনা করেননি। এবং সম্পূর্ণ আন্দাজে অনুমান নির্ভর কাগজে কলমে যোগ বিয়োগ হিসাব করে মিলিয়ে নিয়ে পছন্দের একজনকে জয়ী ঘোষণা করে চলে যান। যাওয়ার সময় অফিসার জয়ী প্রার্থীর এজেন্ট ছাড়া আর কারও সাক্ষর নেননি।

এবিষয়ে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার সঙ্ঘদেশ বড়ুয়ার কাছে জানতে চাওয়া হলে- অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং বলেন পোলিং এজেন্টদের সামনেই ভোট গণনা করা হয়েছে। কিন্তু ফলাফলের শীটে বাকী পাঁচজন পোলিং এজেন্টের সাক্ষর না নেওয়া এবং ফলাফলের হিসাবে গরমিল থাকার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কোনো সদোত্তর দিতে পারেননি। শুধু তাই নয়- আলাপ শেষ না করেই ফোন লাইন কেটে দেন। পরে অসংখ্যবার তাঁর ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও আর লাইন পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আমিন আল পারভেজের মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন- অভিযোগটি হাতে পেয়েছি। তবে কেন্দ্রের ফলাফলই চূড়ান্ত। এধরণের বিষয়ে রিটার্নিং অফিসারদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়। এখন আইনগত ভাবে ভোট পূণ গণনা বা পূণ নির্বাচন দেওয়ার আইনী অধিকার নির্বাচন কর্মকর্তারও নেই। সংক্ষুব্ধ পক্ষ চাইলে জেলা যুগ্ম জজ আদালতে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল রয়েছে; সেখানে তারা একটি মামলা করতে পারেন। এক্ষেত্রে বাদী সুবিচার পাবার সুযোগ রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *