স্বামী-সন্তান হারিয়েছি,তবুও ঈমান ছাড়িনি

লে’ ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। অবসর কাটাতে ভর্তি হন মিৃশল্প প্রশিক্ষণ কোর্সে। কোর্সের এক মুসলিম সহপাঠীর মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেন। ফলে স্বামী ও সন্তানকে হারাতে হয় তাঁকে। অ্যাবাউট ইসলামে তাঁর অসামান্য সে আত্মত্যাগের কথা লিখেছেন তেরেসা কার্বিন এবং তা ভাষান্তর করেছেন আবদুল মজিদ মোল্লা লে যখন মিৃশল্পের ওপর ক্লাস শুরু করেছেন, তখন তিনি বিশোর্ধ্ব নারী। তিনি ছিলেন বিবাহিত এবং তাঁর ছোট একটি সন্তানও ছিল, যে সবে স্কুলে যেতে শুরু করেছে।

ক্লাসটি শুরু করার পর তাঁর জীবনের নতুন পথযাত্রা শুরু হয়, যা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি। প্রথম ক্লাসেই লে একজন সহপাঠীকে লক্ষ করেন; লের ভাষায় যে ছিল ‘মজার পোশাক’ পরা। ক্লাস শেষে কয়েকজন শিক্ষার্থী তাঁকে কফির আমন্ত্রণ জানাল। মা হওয়ার পর থেকে তার নিঃসঙ্গ সময়ের কথা মনে পড়ল লের। কথা বলার মতো একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তাঁর পাশে ছিল না। ফলে কফি আড্ডায় অংশগ্রহণ ও নতুন বন্ধুদের পেয়ে লে আনন্দিত বোধ করছিলেন। সেদিনের আড্ডা সম্পর্কে লে বলেন, ‘আমি এমন একদল নারীর সঙ্গে বসেছিলাম, যারা গালগল্প করতেই ভালোবাসে। তাদের আলোচনার বিষয় ছিল একজন যুবতী, যে সবার ব্যতিক্রমে হিজাব পরেছিল।

আমি মূলত এমন একদল প্রাপ্তবয়স্ক ও বুঝমান বন্ধু খুঁজছিলাম, যাদের সঙ্গে জীবনের সুখ-দুঃখ ভাগ করা যায়। উচ্চ বিদ্যালয়ের বন্ধুদের মতো কৌতুক ও রসিকতায় মত্তদের ব্যাপারে আমার আগ্রহ ছিল না।’লে সিদ্ধান্ত নিলেন ‘মজার পোশাক পরা’ নারীর সঙ্গে তিনি বন্ধুত্ব করবেন। কয়েক মাসের বন্ধুত্বের পর লে কলেমা শাহাদাত পাঠ করেন। কিন্তু লে তখনো জানতেন না তাঁর যাত্রা মাত্র শুরু হলো।লে বলেন, ‘ইসলামের অনুপম বিশ্বাসে আমি দারুণভাবে উজ্জীবিত ছিলাম। আমি চাইলাম স্বামীসহ আমার জীবনের প্রত্যেকের সঙ্গে তা সমানভাবে ভাগ করে নিতে।

কিন্তু সে যেহেতু মৃিশল্প শেখা, বিভিন্ন বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, ভিন্ন ধর্ম সম্পর্কে জানার সুযোগ দিয়েছিল, তাই মুসলিম হওয়ার সংবাদে সে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হলো।’ ঘনিষ্ঠ সবাই অসংখ্য প্রশ্ন করল। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ প্রকাশ করলেন তাঁর স্বামী। লে বলেন, ‘সে আমার ভেতর ইসলামবিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চাইল, অথচ সে ইসলাম সম্পর্কে কিছুই জানত না। তার কাছে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলার অর্থ ছিল দেয়ালের সঙ্গে কথা বলা। আমি ইবাদত শেখার সময় সে বাধা দিত এবং আমি নামাজ আদায় শুরু করলে সে ঝগড়া শুরু করে। আমার মনে হচ্ছিল, আমার বিয়ে ভাঙতে যাচ্ছে। সব বাধার পরও আমি ইসলাম চর্চা অব্যাহত রাখলাম।

এ সময়টি আমার জীবনে ঝড়ের মতো ছিল। তবে আমার মনে ছিল প্রশান্তি। স্বামী সব সময় আমার নতুন ধর্মবিশ্বাসের ওপর আঘাত করে যাচ্ছিল এবং নতুন ধর্ম ত্যাগ না করলে বিচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছিল। কিন্তু আমি তা প্রত্যাখ্যান করলাম এবং সে তার অঙ্গীকার পূরণ করল।’বিয়ে বিচ্ছেদের পর লে প্রচণ্ড রকম বিপর্যস্ত হলেন। কেননা তিনি শুধু বৈবাহিক জীবন হারাননি, বরং তাঁর বিরুদ্ধে মানসিক ভারসাম্য হারানোর অভিযোগও আনেন তাঁর স্বামী। তার পরও তিনি ঘুরে দাঁড়ান। কারণ—‘আমি কৃতজ্ঞ যে আমি সহপাঠী মুসলিমাকে একজন সত্যিকার বন্ধুরূপেই পেয়েছিলাম।

সে আমাকে তার বাড়িতে আশ্রয় দিল। যত দিন না আমি চাকরি খুঁজে পাই এবং একটি অবস্থানে যেতে পারি। সে বলে, জীবনে কঠিন সময় আসে; কিন্তু তা স্থায়ী কিছু নয়। কখনো কখনো ভবন সংস্কারের জন্য তা ভেঙে ফেলতে হয়। এভাবে কখনো কখনো আমাদের জীবনও ভেঙে ফেলতে হয়। শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার আগে বিশৃঙ্খলা দেখা যায়।’লে নতুন চাকরি নিয়ে স্থিতিশীল জায়গায় যাওয়ার পর তাঁর সাবেক স্বামী তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন এবং মেয়েকে ধর্মান্তর করবেন—এমন অভিযোগে তাকে নিজের কাছে নিয়ে যায়।

ফলে লের জীবনে আবারও দুঃখের দিন শুরু হয়। তার পরও তিনি নতুন জীবন শুরু করেন। একজন মুসলিম পুরুষকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের দুটি ছেলে ও একটি মেয়ে সন্তান হয়। নিজের জীবনসংগ্রাম সম্পর্কে লে বলেন, ‘আমি বলব না, ইসলাম গ্রহণের পর আমি খুব সুখে দিন কাটিয়েছি। তবে আমি হাসিমুখেই প্রতিকূল পরিস্থিতে মোকাবেলা করেছি। কেননা ইসলাম আমাকে সে মানসিক শক্তি ও সামর্থ্য দিয়েছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *