আফগানিস্তানকে কমিউনিস্ট বানানোর চেষ্টার ভয়াবহ পরিণাম

সাংবাদিক গাহিজ হত্যার মতোই এক ভয়াবহ, ক্রুর কিন্তু প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড দিয়েই সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে তাদের আগ্রাসনের সূচনা করে। তখন আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন হাফিজুল্লাহ আমিন। তিনি এর আগে ১৯৭৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট নূর মোহাম্মদ তারাকির বিরুদ্ধে এক সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত

এবং ৮ অক্টোবর তাকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করেন। সামরিক বাহিনীর সহায়তায় দেশের ক্ষমতা দখল করে নিয়ে প্রেসিডেন্টের পদে আসীন হন তিনি। এই দু’জনই ছিলেন কট্টরবাদী কমিউনিস্ট দল-পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব আফগানিস্তান-পিডিপিএ’র নেতা। আমিন এক সময় যুক্তরাষ্ট্রে লেখাপড়া করলেও গড়ে ওঠেন ভয়াবহ নিবর্তনবাদী পাঁড় কমিউনিস্ট হিসেবে।

তার আমলে হাজার হাজার আফগানকে শুধু বিরোধী মতের বা কমিউনিস্ট বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে চিহ্নিত করে আফগান গোয়েন্দা সংস্থা- দি ন্যাশনাল ডিরেক্টরেট অব সিকিউরিটি (এনডিএস) হয় হত্যা করে, না হয় গুম করে দেয়। হত্যার শিকার কারো লাশ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আমিনের ‘অবসেশন’ ছিল কথিত ‘প্রগতিশীল’ জাতি গঠন

যেখানে রাষ্ট্রীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক জীবন-সব চলবে সোভিয়েত স্টাইলে। গ্রামাঞ্চলের পর্দানশিন মহিলাদের জোর করে বোরকা খুলে দেয়াসহ নানারূপ ‘তুঘলকি’ কারবার শুরু হয় আমিনের হাত দিয়ে। কাবুল ও বড় শহরগুলোয় কমিউনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী কিছু ছাত্রীর স্কার্ট পরে ঘোরার ছবি ফলাও করে মিডিয়ায় প্রকাশিত হলো। ধারণা দেয়ার চেষ্টা হয় যে,

আফগানিস্তানে নারীদের ‘ব্যাপক অগ্রগতি’ হয়েছে! এসব ছিল সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’ বইয়ে উল্লিখিত বাদশাহ আমানুল্লাহর জোর করে আফগানদের কোট টাই পরানোর উদ্যোগের মতো। মুজতবা আলীর ভাষায়, ওইসব সাহেবি পোশাককে আফগানরা ‘দেরেশী’ হিসেবে ব্যঙ্গ করা শুরু করে। দেখা যেতে থাকে কারো

গলায় ঝুলছে টাই নামের চিকন কাপড়, প্যান্ট উঠে গেছে হাঁটুর কাছে, কোটের কোনো আগামাথা নেই! আমানুল্লাহর কাছে এটাই ছিলো বিশাল অ্যাচিভমেন্ট। এসব চটকদার স্ট্যান্টবাজিতে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভ। এরই সুযোগ নেয় ডাকাত বাচ্চায়ে সকাও। এসব ছিল সেই ১৯২৯ সালের কথা।

হাফিজুল্লাহ আমিনও জোর করে আফগানদের কমিউনিস্ট বানাতে চেয়েছিলেন। আমিন তার এসব নিবর্তনমূলক কাজ বৈধ করার জন্য প্রায়ই বলতেন, ‘Comrade Stalin showed us how to build socialism in a backward country.’ অর্থাৎ, ‘কমরেড স্ট্যালিন আমাদের শিখিয়েছেন কিভাবে একটি পশ্চাৎপদ দেশে সাম্যবাদ দাঁড় করাতে হয়!’ বিরোধী মতকে রাষ্ট্রীয় সব সংস্থা দিয়ে নিপীড়ন করাকে তিনি মনে করতেন পশ্চাৎপদ সমাজকে এগিয়ে নেয়া, যেমনটি করেছিলেন স্ট্যালিন চার কোটির বেশি নিজ দেশের নাগরিক হত্যা করে।

আমিনের এসব হাস্যকর বর্বরতার বিরুদ্ধে দেশে চরম প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যক্ষ আশকারা থাকায় সাধারণ জনগণ অসহায় হয়ে পড়ে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে অসন্তোষ। এমনি সময়ে সোভিয়েত ক্ষমতাসীনরা আফগানিস্তানে সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে পুরো দখল করে নেয়ার পরিকল্পনা আঁটেন।

এসব টের পায় সিআইএ ও আইএসআই। তখন পাকিস্তান অতি গোপনে ১৯৫১ সালে তাদের মিলিটারি ডকট্রিনে অন্তর্ভুক্ত উত্তর-পূর্ব সীমান্ত প্রদেশ ও বালুচিস্তানে সম্ভাব্য সোভিয়েত আক্রমণের প্রেক্ষাপটে গেরিলা যুদ্ধের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়। তারা সীমান্ত এলাকায় পশতুনদের বিশ্বস্ত অংশকে প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করে।

সিআইএ এসে সাথে জোটে। তারা আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট আগ্রাসন ও কৌশলগত পরিবর্তন মোকাবেলায় ‘মুজাহিদিন বাহিনী’ গড়ে তুলতে থাকে। সোভিয়েত ক্ষমতাসীন মহল এ পটভ‚মিতে ১৯৭৯ সালের ১২ ডিসেম্বর আফগানিস্তানে সামরিক আগ্রাসন পরিচালনায় আর দেরি করা যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়।

এক পর্যায়ে সোভিয়েত প্রতিরক্ষামন্ত্রী দিমিত্রি উস্তিনভ সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রতি নির্দেশ জারি করে বলেন, ‘The state frontier of the Democratic Republic of Afghanistan is to be crossed on the ground and in the air by forces of the 40th Army and the Air Force at 1500 hrs on 25 December’. অর্থাৎ ২৫ ডিসেম্বরের বেলা ৩টার মধ্যে সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালাবে।

হাফিজুল্লাহ আমিনকে ওই সময় সোভিয়েতদের মূল উদ্দেশ্য যে আফগানিস্তানে দখলদারিত্ব কায়েম করে পাকিস্তানের বালুচিস্তান দখল করা সে সম্পর্কে একটি গোপন রিপোর্ট দিয়েছিল আফগান গুপ্তচর সংস্থা। কিন্তু অন্যান্য একনায়ক কমিউনিস্টের মতো আমিন সেই রিপোর্টকে মোটেই গুরুত্ব দেননি। বরং তিনি বলেছিলেন, সোভিয়েতরা তার

সরকারকে সহায়তা ও আফগানিস্তানকে একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে আসছে সাময়িকভাবে। তার পরও তিনি প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ ত্যাগ করে ২০ ডিসেম্বর কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী সমৃদ্ধ তাজবেগ প্রাসাদে চলে যান। সেখানে মোতায়েন করা হয় আড়াই হাজার সশস্ত্র সেনা ও কয়েকটি ট্যাংক। এর মাঝে কেজিবি ১৩ ডিসেম্বর স্নাইপারের মাধ্যমে গুলি করে আমিনকে হত্যার পরিকল্পনা আঁটে। অলৌকিকভাবে আমিন বেঁচে যান। তিনি উল্টো মনে করেন যে, সিআইএ তাকে হত্যার চেষ্টা করেছে!

চার দিকে আশঙ্কা, অনিশ্চয়তার মধ্যে ২৫ ডিসেম্বর সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তানে প্রবেশ করে আফগান সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহায়তায়। ১৯৭৮ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘বিশ বছর মেয়াদি মৈত্রী ও বন্ধুত্ব চুক্তি’র আওতায় শুরু হয় ওই আগ্রাসন। কাবুল বিমানবন্দরে একের পর এক বিশালাকৃতির সামরিক পরিবহন বিমান নামতে থাকে। সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে ট্যাংক, সাঁজোয়া যান, ভারী কামানসহ হাজার হাজার মিলিটারি যান। প্রায় এক লাখ সৈন্যের বিশাল সোভিয়েত বাহিনী অবস্থান নেয় আফগানিস্তানের কৌশলগত স্থানগুলোতে।

২৭ ডিসেম্বর দুপুরে তাজবেগ প্রাসাদে লাঞ্চ পার্টি দেন আমিন। সেখানে বাবুর্চি বেশে কর্মরত এক কেজিবি এজেন্ট স্যুপে বিষ প্রয়োগ করে আবারো আমিনকে হত্যার চেষ্টা চালান। আমিন অজ্ঞান হয়ে পড়েন। কিন্তু এবারো বেঁচে যান। এরপর কেজিবি ও সোভিয়েত বিশেষ বাহিনী তাদের দ্বিতীয় পরিকল্পনা ‘অপারেশন স্টর্ম-৩৩৩’ শুরু করে।

তারা ঝটিকা আক্রমণে প্রেসিডেন্টের তাজবেগ প্রাসাদে প্রবেশ করে তাকে সপরিবারে হত্যা করে। তার একটি মাত্র মেয়ে ছাড়া বাকি প্রায় ডজন দুয়েক পুত্রকন্যাকে হত্যা করা হয়। পরদিন সোভিয়েত ও আফগান মিডিয়ায় আমিনকে সিআইএ’র অনুপ্রবেশকারী ও কমিউনিজমের শত্রæ বলে বিষোদগার করা হয়। বলা হয়, ‘আফগানিস্তানে নতুন সূর্য উঠেছে, প্রগতির ধারায় এগিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে!’ ক্ষমতায় বসানো হয় আরেক সোভিয়েত পুতুল বাবরাক কারমালকে।

এভাবেই নির্মমতা, ছলনা, সামরিক শক্তি, ভণ্ডামির মাধ্যমে শুরু হয় দশ বছর মেয়াদি ইতিহাসের ভয়াবহতম ক্রুর এক সামরিক দখলদারিত্বের। অঘটনের সেই শুরু। লাখ লাখ স্বাধীনচেতা আফগানকে হত্যা করে দখলদার সোভিয়েত বাহিনী ও তাদের আফগান দোসর কমিউনিস্ট পেটোয়া বাহিনী। প্রায় পঞ্চাশ লাখ আফগান সোভিয়েত আগ্রাসনের হাত থেকে জীবন, মান-সম্ভ্রম বাঁচাতে আশ্রয় নেয় পাকিস্তান ও ইরানে। অনেকে চলে যায় পশ্চিমা দেশগুলোতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *