হঠাৎ চীন-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্ব কেন?

দক্ষিণ চীনসাগর ঘিরে এশিয়ায় আরেকটা সামরিক জোট হচ্ছে, এতে চীনের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক। তবু চীনের প্রতিক্রিয়া অতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। চীন এক শব্দের এক ছোট মন্তব্য করেছে- ‘ইরেসপন্সিবল’ মানে দায়িত্বজ্ঞানহীন। খুবই গভীর অর্থবোধক মন্তব্য সন্দেহ নেই। কেন?

চীন-আমেরিকার মূল দ্বন্দ্ব বা বিরোধ হলো, গ্লোবাল সিস্টেমের নেতৃত্ব। যা মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতা কেন্দ্রিক- আর সেই নেতৃত্বের অবস্থান থেকে আমেরিকা ক্রমেই ঢলে পড়ছে; বিপরীতে চীন উঠে আসছে। এই হলো বাস্তবতা।

তার একটা বড় প্রকাশ হলো, স্টাডি রিপোর্টগুলো বলছে আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এখানে মূল কথা হলো, অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে কথা হচ্ছে,

কোনো সামরিক সক্ষমতা নয়, কোনো রাজনৈতিক চিন্তার বিরোধ বা সক্ষমতাও নয়। অর্থাৎ এটা একেবারেই অবজেকটিভ সক্ষমতা, সাবজেকটিভ একেবারেই নয়। আমেরিকা যুদ্ধ করে জয়লাভ করলেও তাতে চীনের চেয়ে অর্থনৈতিক সক্ষমতায় সমান হতে পারবে না।

অর্থনৈতিক সক্ষমতা যুদ্ধে অর্জনের বিষয়ই নয়। তাহলে আমেরিকা-ব্রিটেন সাথে এক অস্ট্রেলিয়া- একে নিয়ে তারা যুদ্ধজোট সাজাচ্ছে কেন? যুদ্ধে জিতলে অস্ট্রেলিয়াও কি চীনের সমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করবে?

এ ছাড়া মারাত্মক দিক হলো, সে কাজটা আবার পরমাণু-যুদ্ধের হুমকি তৈরি করে? যুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া বিজয়ী হলেও কি নিজ বাসিন্দাদের জীবন রক্ষা করতে পারবে? তারা পরমাণুর রেডিয়েশনের মধ্যে বেঁচে থাকবে কী করে? রাজনৈতিক নেতারা তাদের বাঁচাবেন কী করে? আমেরিকা-ব্রিটেনের কি এ ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়াকে ঠেকে দেয়াতে কোনো দায় নেই?

কেউ মানুষ হলে, ন্যূনতম দায়িত্বজ্ঞান বোধ থাকলে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না; যেখানে পরমাণু শক্তির বাণিজ্যিক বা সামরিক সর্ববিধ ব্যবহার বন্ধ করা, ন্যূনপক্ষে একেবারে কমানো- এটাই এখনকার মুখ্য গ্লোবাল ট্রেন্ড।

চীনের সাথে বিরোধ করার বিশেষ করে রাজনৈতিক বিরোধিতা করার জন্য পশ্চিমের বহুবিধ বিষয় আছে। সদর্পে লড়া তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক ফোরামে বাধা দেয়া দরকারও সম্ভবত যাতে চীন তা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। তা অবশ্যই আমেরিকা করতেই পারে। কিন্তু তাই বলে এই বাধা দেয়া পারমাণবিকভাবে? তাও আবার একটা অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিরোধে? পশ্চিম বা আটলান্টিকের বাসিন্দাদের এই ইস্যুতে আজীবন এর জবাবদিহিতা করতে হবে।

এশিয়ায় বাংলাদেশসহ আমরা কেউ অবশ্যই কোনো অর্থনৈতিক জোটের বাইরে কোনো সামরিক বা যুদ্ধজোটে যুক্ত হতে পারি না। ওবামার ‘এশিয়া পিভোট নীতি’ ফেল করেছিল। পরের কোয়াডও ফেলের পথে। সাউথ চায়না সি-এর আশপাশের (অস্ট্রেলিয়া জাপান ছাড়া) যেমন আসিয়ানভুক্ত কোনো দেশ এসব জোটে অংশ নেয়নি।

অর্থাৎ যাদের সাথে চীনের সমুদ্রসীমা বিরোধ আছে এমন কোনো দেশ আমেরিকার জোটে কখনো অংশ নেয়নি। অর্থাৎ তারা ন্যায্যভাবে তাদের বিরোধের মীমাংসা চায়; কিন্তু আমেরিকার কোলে চড়ে নয়, কিংবা আমেরিকার পাতা কোনো যুদ্ধজোটে যোগ দিয়ে নয়।

আমেরিকার এই ব্যর্থতাই কি যথেষ্ট প্রমাণ নয় যে, ওরা কেউ ওখানে কোনো যুদ্ধজোট গড়ার দরকার মনে করে না? এর পরেও আমেরিকা ছাড়েনি। মনে হচ্ছে আবার এশিয়ার জন্য এক মহাদুর্যোগ সামনে! এটাও পার হতেই হবে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *