ক্ষমতা গ্রহণের একদম দাঁড় প্রান্তে তালেবান

রোববার তালেবানরা কুন্দুজের বাণিজ্যিক কেন্দ্রসহ আফগানিস্তনের ৩টি শহর দখল করেছে। কর্মকর্তারা বলেছেন যে, তালেবানের আক্রমণ সম্প্রতি ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে যার ফলে ৩ দিনের মধ্যে ৫টি প্রাদেশিক রাজধানী দখল করে নিয়েছে। ক্রমেই তালেবানরা প্রমাণ করছে যে, মার্কিন সামরিক সমর্থন ছাড়া আফগান পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি সরকারের।

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার শুরুর পর থেকেই তালেবানরা আফগানিস্তানের ৪০০ জেলার অর্ধেকের বেশি দখল করেছে এবং প্রাদেশিক রাজধানীতে তাদের সাম্প্রতিক হামলা তালেবান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ২০২০ সালের শান্তি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। সেই চুক্তির অধীনে তালেবানরা কুন্দুজের মতো প্রাদেশিক কেন্দ্রে হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল,

যা দেশটি থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের পথ তৈরি করেছিল। আফগানিস্তানের ৫টি প্রাদেশিক রাজধানী দ্রæত পতন হয়েছে। নিমরুজ প্রদেশের রাজধানী যারাঞ্জ, সর্বপ্রথম ৬ আগস্ট পতিত হয়। এর একদিন পর জাওজান প্রদেশের রাজধানী শেবেরগান, কুন্দুজ, সার-ই-পুল, তালোকান এবং দেশের ৩৪টি প্রাদেশিক রাজধানীর মধ্যে

আরও ৩টিকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় তালেবনরা। যদিও এগুলোর কোনোটিই দেশটির বৃহত্তম শহরগুলোর মধ্যে পড়ে না, সেগুলোতে তালেবান নিয়ন্ত্রণ আফগানিস্তানের যুদ্ধে একটি অনাকাক্সিক্ষত শক্তিশালী পরিবর্তন চিহ্নিত করেছে, যা গত ২০ বছরে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতিতে তীব্রভাবে অনুভ‚ত হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আফগান শহরগুলো দখল করার জন্য তালেবান সামরিক অভিযানের শক্তি বৃদ্ধির অর্থ হল, আফগানিস্তানে একটি রক্তাক্ত নতুন অধ্যায়ের সূচনা। গত শুক্রবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ডেবোরা লিওন্স বলেছেন, ‘এটি এখন একটি ভিন্ন ধরনের যুদ্ধ, সাম্প্রতিক সিরিয়া বা সারায়েভোকে মনে করিয়ে দেয়, যা খুব বেশি আগের কথা নয়।’ তিনি বলেন, ‘বিপুল ক্ষতি সাধন এবং ব্যাপক বেসামরিক হতাহত হবে জেনে বুঝেও শহরাঞ্চলে আক্রমণ চালানো হচ্ছে।’

প্রাদেশিক কেন্দ্রগুলোতে একযোগে অবরোধ অভিযান আফগান নিরাপত্তা বাহিনীকে ক্লান্ত করে দিয়েছে এবং তাদের সামরিক সম্পদকে বিপজ্জনকভাবে তলানিতে নামিয়ে এনেছে। হতাশ হয়ে আফগান বাহিনী সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দক্ষিণে লশকরগাহ ও কান্দাহার, পশ্চিমে হেরাত এবং উত্তরে কুন্দুজের মতো শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো রক্ষায় মনোনিবেশ করেছে।

তালেবানের এই দ্রুত ও লাগাতার বিজয় আফগান সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলের সীমা এবং আফগান নিরাপত্তা বহিনীর ক্ষমতা নিয়ে শঙ্কা বৃদ্ধি করেছে। সেই সাথে, তালেবানরা তাদের সাম্প্রতিক বিজয়গুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় জানান দিচ্ছে যে, তাদের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন অনিবার্য।

যে চুক্তির প্রতিশ্রুতি অনুসারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে প্রস্থানের উদ্যোগ নিয়েছিল, বাস্তবে, সেই চুক্তিটি ছিল আমেরিকান মিশনের ব্যর্থতা আড়াল করার একটি কৌশল বলে প্রতীয়মান হয়েছে। গত রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কানে আফগান পরিস্থিতির খবর পৌঁছালেও একদা মার্কিন মদদপুষ্ট আশরাফ গনির সরকারকে সাহায্য করার মতো উল্লেখযোগ্য সিদ্বান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকেন তিনি।

এদিকে, তালেবানের জয়ের ধারাবাহিকতা দেশটির রাজধানী কাবুলকে কৌশলগত ও মনস্তাত্তি¡কভাবে ঘিরে ফেলেছে। অন্যান্য ফ্রন্টের ওপর চাপ বাড়িয়ে তালেবানরা কাবুলের অভ্যন্তরে হামলা চালানোর ক্ষমতাও তুলে ধরেছে। এ সপ্তাহে তালেবানরা এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার বাসভবনে কয়েক ঘণ্টার আক্রমণ এবং কাবুলে একজন সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তাকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে।

তালেবানরা যেকোনো মূল্যে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করতে বদ্ধপরিকর এবং রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনিসহ কোন কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তা ৫টি প্রাদেশিক রাজধানী দখল করার বিষয়ে মন্তব্য করেননি। অপর্যাপ্ত সামরিক বাহিনী ও সরঞ্জাম নিয়ে গনি সরকারের পতন এখন কিছু সময়ের ব্যাপার বলেই প্রতীয়মাণ হচ্ছে। সূত্র : দ্য ইকোনোমিস্ট, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *