কী করবে ভারত?

চীনকে মোকাবেলা করতে প্রভাবশালী পশ্চিমা তিনটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগে অকাস নামের একটি নিরাপত্তা চুক্তি হয়েছে। জন্ম-ঘোষণার শুরু থেকেই এরা পরিষ্কার যে, এটা সামরিক জোট।

কিন্তু আগেই এ নিয়ে আমাদের বোঝাবুঝির কাজ কয়েক ধাপ এগিয়ে রেখেছে রাশিয়ান মিডিয়া স্পুটনিক। স্পুটনিকের সে নিউজের শিরোনামটাই অনেক সাংঘাতিক। শিরোনাম হলো- ‘ভারতের জন্য বার্তা? নয়া জোটের ঘোষণায় কোয়াডের

অস্তিত্ব আর আমেরিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক উঠেছে।’ স্পুটনিক কেন এমন শিরোনাম করল? কারণ স্পুটনিক লিখেছে এই নয়া জোটের খবর ভারতের বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোড়ন ও তর্ক তুলেছেন। তারা ভালোভাবে নেননি। কিন্তু এত তর্ক উঠছে কেন?

কারণ তারা সবাই ভারতের মনের আসল ইচ্ছাটা জানেন। আর তা হলো, ভারত কারো সামরিক জোটে কখনো যাবে না। তাই তারা বলছেন, এই ‘অনিচ্ছুক’ ভারতের খবর তো বাইডেনের আমেরিকার অজানা নয়। তাহলে বাইডেনের এই নয়া জোটের ঘোষণার অর্থ হলো, তিনি ভারতকে ছেড়ে অন্যান্য সম্ভাব্যদের নিয়ে এশিয়ায় অন্য কিছু খুঁজতে নেমে গেলেন তা হলে।

স্পুটনিক এখানেই না থেমে আরেক ধাপ এগিয়েছে। ভারতের এক সাবেক নেভি অভিসার শেষাদ্রি ভাসান যিনি এখন চেন্নাইভিত্তিক এক থিংকট্যাংক পরিচালনা করেন, তার সাথে এ নিয়ে কথা বলে তার বয়ান সংগ্রহ করেছে। শেষাদ্রি বলছেন, ‘ভারত বারবার জানিয়েছে, সে কোয়াডকে কোনো সামরিক জোট হিসাবে দেখে না,

বড় জোর এক নিরাপত্তা স্বার্থবিষয়ক গ্রæপ হিসাবে ভারত দেখতে চায়।’ এ ছাড়া সে দেখিয়েছে যে ‘তাইওয়ান প্রণালী বা দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে কোনো সামরিক সঙ্ঘাত দেখা দিলে ভারত সে ক্ষেত্রে আমেরিকার সাথে কোনো সামরিকভাবে জড়িত হতে অনিচ্ছুক।’ তাই আমার ধারণা আমেরিকা নিশ্চয় (আমাদেরকে ছাড়া) অন্য আগ্রহী পার্টনার খুঁজছিল।

আসলে সত্যিকারভাবে বললে, ‘ভারতের অবস্থান সবসময়ই ছিল এমন যে ‘মাংসের ঝোল খাবো কিন্তু মাংস খাবো না।’ অর্থাৎ নিরাপত্তাবিষয়ক গ্রæপের জোটে থাকব কিন্তু ‘সামরিক অ্যালায়েন্স’ এমন জোটে থাকব না। তাহলে নিরাপত্তাবিষয়ক কোনো গ্রুপের জোটে ভারতের থাকার দরকারটা কী? আবার কোয়াডের অধীনে সদস্য রাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়ায় ভারতের অংশ নেয়ারইবা দরকার কী? এটা কি সামরিক তৎপরতায় যোগ দেয়া হয়ে যায়নি?

এমনকি সাউথ চায়না সি-কেন্দ্রিক কোয়াড জোট যে এলাকা ভারতের কোনো সীমান্ত ভ‚মি নয়, কোনো স্বার্থও নেই সেখানে। আসলে চীনবিরোধী জোট দেখেই ভারত ছুটে গিয়েছিল কিন্তু ‘শুধু ঝোল খাবার পণ’ করাতে এখন ভারতের মনে যা ছিল-আছে তা উদাম হয়ে যাচ্ছে।

তবে শেষাদ্রি আরেক মন্তব্য করেছেন, যা থেকে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভারত কোয়াডে থাকবে না কারণ কোয়াড ত্রিদেশীয় নয়া জোটে বিলীন হচ্ছে। বলেছেন, ‘কোয়াড আগামীতেও হয়তো নিজেকে দরকারি করে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। কারণ নতুন ত্রিদেশীয় জোট তো প্রতিরক্ষাভিত্তিক।’ অর্থাৎ তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন কোয়াডই ত্রিদেশীয় জোট হতে যাচ্ছে।

তবে ওই একই স্পুটনিক রিপোর্টে এক প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের বয়ান এসেছে যার নাম অনিল ত্রিগুণায়াত। এ ছাড়া এমনকি বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করসহ আরো অনেকের উদ্ধৃতি তুলে এনেছে।

তবে তাদের সবার মূল কথাটা হলো নিজেদের দেয়া ‘সান্ত¡না’। ভারতের ‘মন খারাপের কিছু নেই’ ধরনের বা ‘হতাশ হবার কিছু নেই’ এরকম। যেমন একজন বলছেন, এখন থেকে ভারতের আলাদা আলাদা করে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত।

ওই সাবেক রাষ্ট্রদূত কথা বলতে গিয়ে যেসব সংগঠনে ভারতের কদর আছে বলে গৌরব করে তা জানিয়েছেন যেমন ব্রিকস অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠান আর এসসিও (সাংহাই করপোরেশন)। কিন্তু ব্যাপার হলো, এ দুটোই আসলে চীনা উদ্যোগের জোট

যেখানে চীনের মূলত প্রধান পার্টনার হলো রাশিয়া। এর অর্থ রাষ্ট্রদূতেরই কথা অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমা দুনিয়ায় ভারতের ভাত নেই। অন্য জায়গায় থাকলে যতটুকু যা আছে তা নয়া নেতা চীনেরই উদ্যোগের। যে চীনকে আবার আপাতত দেখা যাচ্ছে, ভারত শত্রু মনে করছে।

তবু বহুবার লিখেছি ভারতের ন্যাচারাল ফ্রেন্ড মানে বিষয়-আশয় বা অর্থনৈতিক স্বার্থবিষয়ক কমন ও প্রধান পার্টনার হবে চীন। আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রেখে ভারতকে ‘মুই কি হনু রে’ অবস্থা করে দূরে ঠেলে সরিয়ে রাখা নিশ্চিত করেছে। আর ভারত আমেরিকান আকাক্সক্ষা মোতাবেক নিজেকে সেই বাক্সে ঢুকিয়েছে। ভেবেছে, সে পরাশক্তি হয়ে গেছে। এটা প্রণব বা মোদি কারো আমলেই ভিন্ন কিছু হয়নি। বুশ-ওবামা আমলে তারা মাত্র ১৬ বিলিয়ন ডলারের আমেরিকান রফতানির বাজার সুবিধা দিয়েছিলেন। আর তাতেই জাতিবাদী ভারত কেঁচো হয়ে গিয়েছিল। এমনকি ট্রাম্প সেসব রপ্তানি সুবিধা বাতিল করে দিলেও ভারত আর আমেরিকার হাত ছাড়তে পারেনি। অথচ এখন দাবি করছে তারা আমেরিকার সাথে সামরিক জোটে যাবে না! এ জন্যই এটাকে মাংস খাব না কিন্তু ঝোল খাবার লোভ বলেছি। ফলে এখনো যদি বাইডেন ১৬ না হোক ১০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি সুবিধা ভারতকে দেন সে ক্ষেত্রে ভারত কি বাইডেনের সামরিক জোটে যাবে না? আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না। এই হলো পরাশক্তি ভাবধরা ভারতের বিবেচনাবোধ!

বুদ্ধিমানরা একসাথে সব দ্বন্দ্বের মীমাংসা করতে যান না। কারণ এটা কার্যকর পদ্ধতি নয় আর তা করাও যায় না। প্রত্যেকবারে নতুন জেগে থিতু হয়ে ওঠা প্রধান দ্ব›দ্বটারই কেবল মীমাংসা করে আগাতে হয়; যেমন এখনকার মূল দ্ব›দ্ব চীন-আমেরিকার। ফলে ভারতের দিক থেকে তা হতে হবে চীন-ভারত এক দিকে বনাম আমেরিকা, এভাবে দ্বন্দ্বের পক্ষ-বিপক্ষ সাজানো। এরপর তা সমাধান বা দ্ব›দ্বমুক্ত বিনাশ হয়ে গেলে তখন আবার মুখ্য দ্ব›দ্ব হিসেবে তা চীন-ভারত দ্ব›দ্ব হতে পারে। তত দিনে ভারতের অর্থনৈতিক মুরোদ অন্যকে বলার মতো করে বাড়িয়ে নেয়া যাবে আর তা দরকারও; যদিও এমনটা অর্জনের আগে দুটা আরো অভ্যন্তরীণ সংস্কার ভারতকে করতেই হবে। এক. হিন্দুত্ববাদ ত্যাগ করে দেশের সবাই নাগরিক ও সমান অধিকারের- এমন এ পরিচয়ে নাগরিক অধিকারভিত্তিক এক নয়া ভারতরাষ্ট্র তাকে গড়ে নিতেই হবে। আর দ্বিতীয়টা প্রথমটারই অনুষঙ্গ। তা হলো নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করা। ফলে হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দু জাতিবাদ বাদ দিতে হবে। এমনকি অবুঝ ট্রাম্পের মতো অর্থনৈতিক জাতিবাদও বাদ দিতে হবে। কারণ ইতোমধ্যে আমরা সবাই এক গ্লোবাল বাণিজ্য লেনদেনের যুগে একেবারে ঢুকে গেছি। আর এটা ‘ওয়ান ওয়ে’।

এই ‘পুলসিরাত’ পার হতে পারলে ভারত পরে সবকিছু হতে পারবে। নইলে ‘কিছুই নয়’। এর আগে ভারতের ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি হেরে গেলে নতুন যারাই কোয়ালিশনে ক্ষমতায় আসুক তারা সম্ভবত চীনের অর্থনৈতিক পার্টনার হওয়ার পথে যাবে। আর তাতে অর্থনৈতিকভাবে ভারত আরো সক্ষম হয়ে যাবে দ্রুত। কিন্তু তবু আমেরিকার থেকেই ভারত সামরিক সরঞ্জাম কিনবে। কিন্তু তা চীনের সাথে সম্পর্ক ক্ষতি করবে না। এমনটা ঘটার সম্ভাবনার দিকে এখন পরিস্থিতি যাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। আর সে ক্ষেত্রে আপাতত ভারতকে কোয়াড থেকে বের করে দিলেও আমেরিকার সাথে মোদির ঘনিষ্ঠতা থেকেই যাবে। ভারতের নেতৃত্বের ওপর অবশ্যই কোনো আস্থা নেই। যদিও পথ যে আছে, তা দেখানোর জন্য রেকর্ড রাখা আরকি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *