আবু ত্ব-হা আদনানের বিষয়ে ‘চাঞ্চল্যকর তথ্য’ সিটিটিসির কাছে!!

সম্প্রতি পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) হাতে গ্রেফতার হয়েছেন নব্য জেএমবির সামরিক শাখার প্রধানসহ চারজন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এ সংক্রান্ত তদন্তে নব্য জেএমবির সদস্যদের ‘পাহাড়ে হিজরত’ কার্যক্রমের কথা জানা গেছে। এক্ষেত্রে আলোচিত ধর্মীয় বক্তা আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনানের ওয়াজের প্রভাবের তথ্যও উঠে এসেছে। মিলেছে খোদ তার সম্পর্কেই ‘চাঞ্চল্যকর তথ্য’।সিটিটিসি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নব্য জেএমবির সদস্যরা ‘সওয়াব অর্জন’, সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানো এবং গ্রেফতার এড়ানোর জন্য বান্দরবানের পাহাড়ে ‘হিজরত’ করেন। এ উদ্দেশ্যে তারা তিন থেকে চার মাসের জন্য বাসা থেকে বেরিয়ে যান। পাহাড়েই তারা থাকা-খাওয়াসহ সাংগঠনিক সব ধরনের কার্যক্রম চালান। সেখান থেকেই তাদের নেতাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখেন। নব্য জেএমবির সদস্যরা পাহাড়ে স্থায়ীভাবে থাকা ও প্রশিক্ষণের জন্য জমি কেনার চেষ্টাও করছিলেন।

রংপুরের বাসিন্দা আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনান এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ‘নিখোঁজ’ থাকার পর গত ১৮ জুন উদ্ধার হন। পরে পুলিশ জানায়, ত্ব-হা তার তিন সঙ্গীসহ ‘ব্যক্তিগত কারণে’ আত্মগোপন করেন। তবে সে সময় আর বিস্তারিত কিছু কোনো পক্ষ থেকে জানা যায়নি।সিটিটিসি বলছে, পাহাড়ি এলাকায় ‘হিজরত’ থেকে ফিরে সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া নব্য জেএমবির এক সদস্য জিজ্ঞাসাবাদে জানান, বান্দরবানের থানচিতে টিঅ্যান্ডটি এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে জঙ্গি সংগঠনের পড়াশোনা করেন তিনি। সেখানে তিনি চার মাস অবস্থান করেন। দলের নেতাদের পরামর্শে প্রশিক্ষণের জন্য জায়গা খোঁজা শুরু করেন।

নব্য জেএমবির ওই চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে সিসিটিসির তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনান সরাসরি জঙ্গিবাদে না জড়ালেও তার সঙ্গে জঙ্গি গোষ্ঠীর যোগাযোগ রয়েছে। বিভিন্ন উসকানিমূলক ওয়াজ রয়েছে আবু ত্ব-হার ইউটিউব চ্যানেলে। এসব ওয়াজ শুনে নব্য জেএমবিসহ অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্যরা উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকেন।যে চারজন গ্রেফতার

সম্প্রতি সিটিটিসির হাতে গ্রেফতার হন নব্য জেএমবির সামরিক শাখার প্রধান জাহিদ হাসান ওরফে রাজু ওরফে ইসমাঈল হাসান ওরফে ফোরকান ভাই, মো. কাউসার হোসেন ওরফে মেজর ওসামা, সাইফুল ইসলাম মারুফ ওরফে বাসিরা ও মো. রুম্মান হোসেন ফাহাদ ওরফে আব্দুল্লাহ। এদের মধ্যে ফোরকান বাদে বাকিরা বান্দরবানের থানচি থেকে ‘হিজরত’ করে ফিরেছিলেন। কাউসার গ্রেফতার হন গত ১১ জুলাই কেরানীগঞ্জ থেকে। অপর তিনজন গ্রেফতার হন ১১ আগস্ট রাজধানীর কাফরুল থেকে।সিসিটিসি সূত্রে জানা যায়, কাউসার হোসেন ওরফে মেজর ওসামা দীর্ঘদিন থেকে নব্য জেএমবির সামরিক শাখার প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ওই সংগঠনের সামরিক শাখার অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে অনলাইনে ও অফলাইনে যোগাযোগ করে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিতেন। বাংলাদেশের নব্য জেএমবির আমির মাহাদী হাসান ওরফে আবু আব্বাস আল বাঙালির সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।

বান্দরবানের থানচিতে কাউসার হিজরত করেন। তার সঙ্গে একাধিক সঙ্গী ছিলেন।অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতক জাহিদ হাসান ওরফে রাজু ওরফে ইসমাঈল হাসান ওরফে ফোরকান ভাই ‘হিজরত’র উদ্দেশ্যে পাঁচবার মিয়ানমার সীমান্তে যান। এই ফোরকান ড্রোন বানানোর পরিকল্পনাও করেছিলেন। ড্রোনের সঙ্গে এক্সপ্লোসিভ যুক্ত করে কোনো জায়গায় আক্রমণের পরিকল্পনার পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ওপুলিশ বক্সে হামলার পরিকল্পনার সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন। আমিরের নির্দেশে যেসব হামলার ঘটনা ঘটেছে সেসব হামলায় সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন ফোরকান।

সিটিটিসির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) রহমত উল্লাহ চৌধুরী সুমন জাগো নিউজকে বলেন, ‘গ্রেফতার হওয়া সাইফুল ইসলাম মারুফ ওরফে বাসিরার বয়স ২১ বছর। তিনি লক্ষ্মীপুর দারুল উলুম আলিম মাদরাসা থেকে ২০১৯ সালে ফাজিল পাস করেন। ২০১৯ সালে বাসিরা ফেসবুকে আবু জোবায়ের নামে একজনের কাছ থেকে নব্য জেএমবির দাওয়াত পান। পরে কাউসার হোসেন ওরফে মেজর ওসামার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওসামার সঙ্গে সরাসরি দেখা করার জন্য তার বাড়িতে যান বাসিরা। ২০২০ সালে ওসামাকে একটি হামলা করতে বলেন জোবায়ের এবং এজন্য একটি ভিডিও পাঠান। পরে তারা ঢাকা থেকে বোমার সরঞ্জাম কেনেন। এরপর ভিডিও দেখে একটি বোমা বানান তারা।’

‘এ বছরের শুরুতে কাউসার, বাসিরা ও রুম্মান বন্দরবানের থানচিতে হিজরত করেন। সেখানে টিঅ্যান্ডটি পাড়ার এক বাসায় ভাড়াটিয়া হিসেবে চার মাস থাকেন। এরপর মে মাসে থানচি থেকে বাসিরাকে ডেকে তার নারায়ণগঞ্জের বাসায় নিয়ে আসেন কাউসার।’এডিসি রহমত উল্লাহ চৌধুরী সুমন আরও বলেন, ‘রুম্মান ঢাকায় একটি কলেজে অনার্সে লেখাপড়া করতেন। সাইফুল ইসলাম নামে তার এক খালাতো ভাই রুম্মানকে নব্য জেএমবির দাওয়াত দেন। সাইফুলের মাধ্যমে কাউসারের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। পরে ২১ ফেব্রুয়ারি তাকে হিজরত করতে বলা হয়। এরপরেই মূলত রুম্মান, বাসিরা ও কাউসার হিজরত করতে থানচি যান। থানচিতে তারা একটা বাসা ভাড়া নেন। তারা পাহাড়ে ঘুরতেন এবং গভীর পাহাড়ের ভেতরে থাকার অনেক স্থান, আস্তানা ও প্রশিক্ষণ সেন্টার করার জন্য খুঁজতেন। পরে কাউসার ঢাকা চলে আসেন। রুম্মান ও বাসিরা থানচি থেকে যান।’

আবু ত্ব-হা এবং নব্য জেএমবির সংযোগ নিয়ে সিটিটিসি প্রধান এবং পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আসাদুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আলোচিত ধর্মীয় বক্তা আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনানের ওয়াজ শুনে উদ্বুদ্ধ হয়ে বান্দরবানের পাহাড়ে হিজরত করেন নব্য জেএমবির একাধিক সদস্য। তাদের তালিকা আমাদের কাছে রয়েছে। এদের মধ্যে ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা রিমান্ডে রয়েছেন। এছাড়া আবু ত্ব-হার বিষয়েও চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *