ক্ষমতা নেয়ার পরে এই প্রথম কঠিন বিপদের মুখে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী!

রোহিঙ্গা নিপীড়নকে জাতিসঙ্ঘ ইতোমধ্যেই জাতিগত উৎখাতের একটি অসহনীয় মানবতাবিরোধী দৃষ্টান্ত বলে উল্লেখ করেছে। এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং বিশ্বের প্রত্যেকটি মানবাধিকার সংস্থা বহু আগেই মিয়ানমার সেনাবাহিনী পরিচালিত এই কর্মকাণ্ডকে বর্বর ও মানবতাবিরোধী বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। শুধু স্বীকার নয়,

উপরোল্লিখিত সংস্থাগুলো সারা বিশ্বে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর এই বর্বরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছে। আজকে মিয়ানমারে যা চলছে তা হলো স্রষ্টার পক্ষ থেকে পাল্টা ব্যবস্থা। বিশ্ব সৃষ্টির সূচনা থেকে কোনো অত্যাচারী সে ব্যক্তি হোক, গোষ্ঠী হোক, জাতি হোক, রাষ্ট্র হোক- এই পরিণতি থেকে বাঁচতে পারেনি। ভবিষ্যতেও বাঁচার

সম্ভাবনা থাকতে পারে না। তার শেষ পরিণতি অবশ্যই ধ্বংস। কারণ বিধির বিধান আত্মসমর্পণ ছাড়া বিরত হয় না। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ ধরনের উৎপীড়ক পাপিষ্ঠদের জন্য এই মহাপাপ থেকে বাঁচার একটি মাত্র ওষুধ দিয়েছেন কবিতা আকারে। তা ছাড়া বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই। কবি বলেছেন,

‘তোমার আসন হতে যেথায় তাদের দিলে ঠেলে,
সেথায় শক্তিরে তব নির্বাসন দিলে অবহেলে।
চরণে দলিত হয়ে ধুলায় সে যায় বয়ে
সেই নিম্নে নেমে এসো, নহিলে নাহি যে পরিত্রাণ
অপমানে হতে হবে আজি তোরে সবার সমান।’

এশিয়া নিউজ নেটওয়ার্কের পরিবেশিত একটি খবর থেকে জানা যায়, মিয়ানমারের বিতাড়িত আইনপ্রণেতাদের সমন্বয়ে ‘সিআরপিএইচ’ নামে একটি বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে মোকাবেলা করা এবং তাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব সংগঠন করার জন্য সিআরপিএইচ সংগঠনের সদস্যদের অস্ত্রসজ্জিত করার কাজ শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় হলো, অপরিচিত আক্রমণকারীরা মিয়ানমারের একটি শিল্পাঞ্চলে যেখানে অসংখ্য গার্মেন্ট কারখানা রয়েছে, সম্পূর্ণভাবে আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছে। সেখানে চীনের

মালিকানাধীন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গার্মেন্ট কারখানাও ছিল। শিল্পাঞ্চলে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের জন্য সামরিক কর্তৃপক্ষ এবং শ্রমিকরা পরস্পর পরস্পরকে অভিযুক্ত করে চলেছে। জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমারের জান্তার বিরুদ্ধে

যে নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল তা চীন ও রাশিয়ার তীব্র বিরোধিতার মুখে গৃহীত হয়নি। সে জন্য মিয়ানমারের সামাজিক মিডিয়ায় চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা অব্যাহত রয়েছে। মিয়ানমারে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধেও আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে এবং প্রতিদিন তা প্রকট আকার ধারণ করে চলেছে।

ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড এবং আসিয়ান বাণিজ্য সংস্থার সদস্য দেশগুলো মিয়ানমারের সামরিক জান্তার প্রতিনিধিদের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে মিয়ানমারের বিরোধী দলের সাথে একটি সমঝোতার মাধ্যমে দেশটিতে শান্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়েছিল তাতেও কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখা যায়নি। বরং মিয়ানমারের সামরিক

বাহিনী দেশটির ইয়াঙ্গুন শহরসহ বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি করে চলেছে। এদিকে মিয়ানমারে করোনাভাইরাসের আক্রমণ তীব্রতর হচ্ছে। এই মহামারী নিয়ন্ত্রণেও সামরিক সরকারের কোনো বিশেষ উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বরং বিদ্যমান পরিস্থিতিতে প্রতিবাদী স্বদেশবাসী মানুষকে গুলি করে মারাই তাদের আসল করণীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মিয়ানমারের দজ্জাল সেনাবাহিনী যাদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে এই বর্বর হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে, ইতিহাসের বিধি ও বিধান মতে তাদের ধ্বংস ও বিধাতার রুদ্ররোষের কারণে অবশ্যই আরম্ভ হবে। কারণ, বিশ্বের বিগত ইতিহাসে এ পর্যন্ত এর ব্যতিক্রম ঘটতে দেখা যায়নি। ইতোমধ্যে বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর পক্ষ সমর্থন করার খেলা শুরু হয়ে গেছে।

একবার বিশ্বশক্তিগুলোর খেলা প্রত্যক্ষভাবে শুরু হলে, এর আর শেষ নেই। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইরান, লিবিয়া ইত্যাদি চোখের সামনেই রয়েছে। উপরোক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনামের নিঃশ্বাস কিছুটা ফিরে এলেও বাকি দেশগুলোতে সৃষ্ট আকাশচুম্বী জাতীয় এবং অর্থনৈতিক দুর্দশা কখন কিভাবে শেষ হয় বা আদৌ শেষ হয় কি না তা বলার সময় এখনো আসেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর বিভিন্ন বিধি-নিষেধ জারি আরম্ভ করেছে। বিশ্বব্যাংকের মিয়ানমারের জন্য অনুমোদিত ঋণও বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে সামরিক জান্তা কর্তৃক বিতাড়িত মিয়ানমারের নির্বাচিত আইনপ্রণেতাদের সংগঠন, সিআরপিএইচকে পূর্ণ সাহায্য-সহযোগিতা দেয়া আরম্ভ করেছে বলে জানা যাচ্ছে।

বর্তমানে ওই সংগঠন মিয়ানমারের নির্বাচিত সরকার হিসেবে স্বীকৃতি লাভের প্রয়াস শুরু করেছে, যে প্রয়াসের পেছনে নিঃসন্দেহে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো সমর্থন রয়েছে। যদি বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের স্বীকৃতি এই সরকারের পক্ষে আদায় করা যায়, সে ক্ষেত্রে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পক্ষে মিয়ানমারের ঐক্য এবং সংহতি বজায়

রাখা আর কিছুতেই সম্ভব হবে না। অবশ্য বিশ্বের ইতিহাস বলে, লম্পট, অত্যাচারী ও বর্বর সেনাবাহিনী দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। এশিয়ান দেশগুলো বিশেষ করে চীন এবং থাইল্যান্ড ব্যাপারটা বুঝতে পেরে খুব চিন্তিত বলে মনে হয়। ১৯৪০-এর দশকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ছিল একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো

কোনো শক্তিশালী সংগঠন সে দেশে ছিল না। কিন্তু এখন মিয়ানমারে সু চির দল এনএলডিসহ আরো বহু শক্তিশালী দল গড়ে উঠেছে। এ ছাড়াও রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বর অত্যাচার বিশ্বের সমগ্র মানবজাতি এত বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছে যে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে যারাই মোকাবেলা করবে, সারা বিশ্ব তাদের প্রতি দয়ার, সহানুভূতির, সহযোগিতার এবং সর্বাত্মক সাহায্যের হাত উদারভাবে বাড়িয়ে দেবে।

ইতোমধ্যে মিয়ানমারের স্থাপিত চীনের অনেক শিল্প-কারখানা আক্রান্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে মিয়ানমারে নিজের করণীয় সম্পর্কে চীন ইতোমধ্যে আভাস দিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াংই বলেছেন, ‘China will not waiver in its commitment to advancing China Myanmar relations and will not change the course of promoting friendship and co-operation, no matter how the situation evolves’.

‘অর্থাৎ চীন এবং মিয়ানমারের বন্ধুত্ব রক্ষায় চীন কোনো দিন পিছপা হবে না এবং চীন-মিয়ানমার বন্ধুত্ব এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে পিছপা হবে না। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *