প্রতিশ্রুতি পূরণ করেননি মোদি সরকার!

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন- ইন্দিরা গান্ধী না ইয়াহিয়া খান? এ প্রশ্নটি নিয়ে এখন ভারতের রাজনৈতিক মহলে জোরদার চর্চা হচ্ছে। কারণ এ বছরের মার্চে বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র ভাই দামোদর দাস মোদি ঘোষণা করেছেন, ওই মুক্তিসংগ্রামে তিনি জেল খেটেছিলেন।

সদ্য প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে তথ্য জানার অধিকার আইনের মাধ্যমে কলকাতার উপকণ্ঠে বিধাননগর পুরনিগমের কাউন্সিলর রাজেশ চিরিমার জানতে চেয়েছিলেন, মোদি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কবে থেকে কবে জেলে ছিলেন?প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে ওই কাউন্সিলরকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে, এ ব্যাপারে মোদির দফতরে কোনো তথ্য নেই। কী অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, সাউথ ব্লক তা-ও জানাতে পারেনি।

ভারতের ইতিহাস সম্পর্কে যাদের জ্ঞান আছে, যারা একাত্তর সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জড়িত ছিলেন সেসব প্রবীণ শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ প্রশ্ন তুলেছেন- ২৬ মার্চ ঢাকার জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনাকে পাশে বসিয়ে তিনি যে ডাহা মিথ্যা বলে এসেছেন, সেজন্য দেশের মানুষ তাঁকে শুধু অসত্যবাদীই বলছেন না,

বলছেন তাঁর এ অসত্য আত্মম্ভরিতা; তাঁর হাজার মিথ্যার আরেকটি নজির হিসেবে ভারতের ইতিহাসে যোগ হলো। প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় মোদির বয়স ছিল মাত্র ২২ বছর। তিনি আরএসএসের স্কুলে বারো ক্লাসে পড়ে গুজরাট ও রাজস্থানে আরএসএস প্রচারক হিসেবে কাজ করতেন। তখন বিজেপির জন্ম হয়নি।

সে সময় জনসংঘের সভাপতি অটল বিহারি রাজপেয়ি লোকসভায় বিরোধী দলের নেতা ছিলেন। অটলজি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের পক্ষে একদিন ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ধরনায় বসেছিলেন। সরকারি তথ্যানুযায়ী অটল বিহারি বাজপেয়ি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম সমর্থন এবং ইন্দিরা গান্ধীকে এ ব্যাপারে সব রকম সহযোগিতাও করেছিলেন। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী যিনিই প্রধানমন্ত্রী হোন তার অতীত সম্পর্কে সব নথি প্রধানমন্ত্রীর দফতরে রাখা হয়।

আসলে মোদির ২৬ মার্চ ঢাকায় যাওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পরদিন ২৭ মার্চ ছিল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম পর্যায়ের ভোট গ্রহণ। যাতে বাংলাদেশের নমশূদ্র ও মতুয়ারা এপার বাংলায় বিজেপি এবং আরএসএসকে সমর্থন করে বা ভোট দেয়। না, তাঁর আশা ষোল আনা সফল হলো না। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় নির্বাচনে ১৪ দিন আগেই বাংলাদেশ সরকার সীমান্ত সিল করে দিয়েছিল। তাই পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া ও উত্তর চব্বিশ পরগনা

জেলার ভোট বিজেপিবিরোধী বাক্সেই পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, চট্টগ্রাম প্রভৃতি অঞ্চলের নমশূদ্র তথা মতুয়ারা মোদির পাতা ফাঁদে পা দিয়ে বিজেপিকেই ভোট দেয়। এপার বাংলায় দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, দিনাজপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদে বিজেপি বেশি ভোট পায়। এটিই হলো বাস্তব পরিস্থিতি। সুতরাং তার ২৬ মার্চের ঢাকার বক্তৃতা, তাঁর কারাবরণের কথা সবই অসত্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

মোদিবাহিনী ভেবেছিল তারা এবার পশ্চিমবঙ্গ দখল করে নেবে। তাদের প্রচারে এটাই ছিল প্রধান হাতিয়ার। অবশ্য এ ব্যাপারে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি চুপ করে বসে ছিলেন না। এখন থেকে ১০-১২ বছর আগে থেকেই বাংলাদেশ থেকে রাজাকার, আলবদর, আলশামস, জামায়াত এবং আইএসআইর গুপ্তচররা উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গে জাঁকিয়ে বসেছে।

একাধিক অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিকের সঙ্গে কথা বলেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে মোদি জেল খেটেছেন এ কথা শুনে তারা হো হো করে হেসে উঠেছেন। ভারতের এক বিদেশ সচিব তো বলেই ফেললেন, হিটলার, কর্নেল গাদ্দাফি, ইদি আমিন এবং পাকিস্তানের আইয়ুব-ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে প্রতিটি কাজে মোদির খুব মিল পাওয়া যাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সাবেক বিদেশ সচিব মনে করেন, মোদি আশা করেছিলেন আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সব জনবিরোধী অপকর্ম সমর্থন করে যাবেন। ট্রাম্পকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে আমেরিকা। কিন্তু বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেন ভারতের কোথায় কী হচ্ছে সে ব্যাপারে পুঙ্খানুপুঙ্খ খবর রাখছেন।

তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট মিসেস কমলা হ্যারিস ভারতীয় বংশোদ্ভূত। তামিলনাড়ুর চেন্নাইতে তাঁর বাড়ি। তাঁর পরিবারের সদস্যরা এখনো চেন্নাইতেই থাকেন। তাদের সঙ্গে কমলার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। ভারতে করোনায় মৃতদের যে পবিত্র গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে সে ব্যাপারে বাইডেন খুবই উদ্বিগ্ন।

সবকিছুতে ব্যর্থ হওয়ার পর মোদি সেই পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে শুরু করেছেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন ভারতে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল। আর এ বছর ২৫ জুন মোদি কংগ্রেসকে আক্রমণ করে বাজিমাত করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। কিন্তু বিরোধী দলগুলো মোদির এ কথা শুনতে নারাজ। তারা পাল্টা বিঁধলেন মোদিকে। এবার দেখা যাক জরুরি অবস্থায় ভারতের কী পরিস্থিতি ছিল আর বর্তমানে কী পরিস্থিতি।

মোদি ও শাহের অভিযোগ, ১৯৭৫-এ জরুরি অবস্থার সময় পরিকল্পিতভাবে সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পায়ে পিষে দেওয়া হয়, প্রতিবাদ বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়, জেলবন্দী করা হয় বিক্ষোভকারীদের, সংবাদমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ জারি করা হয়, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণ করা হয় এবং সংসদ ও আদালতকে মূক দর্শকে পরিণত করা হয়।

অন্যদিকে বর্তমানে দেশের যা পরিস্থিতি তাকে ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’ বর্ণনা করে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করেছে, কেউ সরকারের সমালোচনা করলেই তাকে দেশদ্রোহীর তকমা দেওয়া হচ্ছে, সরকারি নীতির বিরোধিতা করলেই সন্ত্রাস দমন আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে, সমাজকর্মীদের ধরে ‘নকশাল’ বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে,

বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে সিবিআই এবং ইডি-কে কাজে লাগানো হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টে সরকারের প্রভাব খাটানোর অভিযোগে বিচারপতিরা বিদ্রোহ করছেন, নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে, তিন কৃষি আইনের মতো কৃষকবিরোধী বিল সংসদে পাস করানো হচ্ছে সংখ্যার জোরে, তথ্যপ্রযুক্তির আইনের নতুন বিধিতে সরকার ইচ্ছামতো পোর্টাল ওয়েবসাইট থেকে খবর সরিয়ে দিচ্ছে ইত্যাদি।

মোদির মিথ্যাচার দিয়ে এ লেখা শুরু করেছিলাম। লেখার শেষে সে প্রসঙ্গে ফিরছি আবার। মোদির আরও একটি মিথ্যাচারের নমুনা পেশ করেই এ লেখা শেষ করব। ২০১৪ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরের বছর তিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে মমতাকে পাশে বসিয়ে শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন, ‘আমার এ প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদের মধ্যেই আমি বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা জলবণ্টন চুক্তি করব।’

তাঁর সরকারের প্রথম পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হয়েছে, তিনি দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসেছেন। শেখ হাসিনাও পরের মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু মোদির সেই প্রতিশ্রুতি ২০২১-এ এসেও বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি এ বছরের ২৬ মার্চ মোদি যখন বাংলাদেশে যান তখন সে দেশের মানুষ ভেবেছিলেন হয়তো তিস্তা চুক্তি নিয়ে

কিছু বলবেন। কিন্তু তাদের সে আশায় জল ঢেলে মোদি বাংলার নির্বাচনের স্বার্থে মতুয়াদের ভোট পাওয়ার আশায় তাদের নাগরিকত্ব ও অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার কথা শুনিয়ে এসেছেন। মোদির মতো এমন অসত্যবাদী নেতা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কলঙ্করূপে চিহ্নিত হয়ে থাকবেন, সন্দেহ নেই।

লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক [ভারত]।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *