নায়িকা হতে গিয়ে স্কর্টগার্ল নদী, তিন সন্তানকে পড়াতেন মাদ্রাসায়

হতে চেয়েছিল নায়িকা। কিন্তু জীবনের করুণ-কঠিন বাস্তবতায় পথ হারিয়ে অন্ধকারে হাঁটতে থাকে নদী। দুঃসহ দিনে পাড়ি দিয়েছে ভিন দেশে। একপর্যায়ে অন্ধকার জগতের রানী হয়ে ওঠে। নানা প্রলোভন দিয়ে দেশ থেকে অসহায় নারীদের নিয়ে গেছে ভারত, দুবাই ও মালয়েশিয়াতে। বাধ্য করেছে যৌনকর্মে। সবুজ ও টিকটক হৃদয়ের গ্যাংয়ের নারী পাচার চক্রের হয়ে ভারতে গড়ে তুলেছে স্কর্ট সার্ভিস ও বিভিন্ন শহরে ভিন্ন ভিন্ন মিনি পতিতালয়। নদীর জীবন শুরু থেকেই ট্র্যাজেডিপূর্ণ। রয়েছে পরতে পরতে থ্রিলারও। নদী নিজে নারী পাচার ও অনৈতিক বাণিজ্য করলেও তার তিন শিশুপুত্রকে লেখাপড়া করাচ্ছে রাজধানীর একটি মাদ্রাসায়।

যৌবনের শুরুতেই প্রেমে পড়েছিল নদী। ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে বিয়েও করেছিল প্রেমিক রাজীবকে। রাজীবের বাড়ি শরীয়তপুর জেলার জাজিরা থানায়। রাজীব একটি রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নেতা ছিলেন। পুরান ঢাকার রায় সাহেববাজারে থাকতো এই দম্পতি। এরমধ্যেই ২০১৫ সালের ২রা নভেম্বর ক্রসফায়ারে মারা যায় রাজীব। নদীর জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। তারপর বিয়ে করে সাইফুল নামে চাঁদপুরের কচুয়ার এক যুবককে। কিন্তু এই বিয়ে বেশিদিন টিকেনি। নারী পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছে নদী।

নারী পাচারে জড়িয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে পুলিশকে নদী জানিয়েছে, স্বামী হারিয়ে দু’চোখে অন্ধকার দেখছিল। বাধ্য হয়ে দেশের বাইরে যায়। সেখানেই যৌন নির্যাতনের শিকার হয় নদী। স্বামী রাজীবের মৃত্যু হলে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাকে বের করে দেয়া হয়। তিন সন্তান নিয়ে অসহায় হয়ে আশ্রয় নেয় শানারপাড়ের একটি বাসায়। প্রয়াত স্বামী রাজীবের এক বন্ধু তাকে অল্প করে আর্থিক সহযোগিতা করতেন। স্কুলের গণ্ডি না পেরুনো নদীর পক্ষে ভালো কোনো চাকরি করাও সম্ভব ছিল না।

মূলত অভাব-অনটনের কারণেই ২০১৭ সালে বানু নামে এক নারীর মাধ্যমে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। ওই বছরের ৮ই এপ্রিল তাকে মালয়েশিয়া নিয়ে যায় বানুর স্বামী রাসেল। সেখানেই পরিচয় হয় সবুজের সঙ্গে। মালয়েশিয়ায় পতিতাবৃত্তি, হোটেলে স্কর্ট সার্ভিস দিয়ে থাকে বাংলাদেশি সবুজ। ইন্ডিয়া মসজিদের মিনারা সিটি ওয়ান বি ব্লকে সবুজের বাসায় নিয়ে যায় নদীকে। সেখানে নদীর পাসপোর্ট নিয়ে তাকে জিম্মি করে সবুজ। এরপর ৯ই এপ্রিল নদীকে নিয়ে যাওয়া হয় কোতারায়া বাংলা মার্কেটের ফাতেমা রেস্টুরেন্টের দ্বিতীয় তলায়। সেখানে পতিতাবৃত্তিতে রাজি না হলে মারধর করা হয় তাকে। তারপর থেকে প্রতিদিন সকাল ৮টায় সেখানে নদীকে রেখে আসতো আবার সন্ধ্যায় বাসায় নিয়ে যেত সবুজ ও রাসেলের লোকজন।

ছয় মাস পর সবুজকে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে পাসপোর্ট ফেরত নেয় নদী। তারপর চায়না টাউন এলাকায় নদী নিজেই শুরু করে অনৈতিক বাণিজ্য। ২০১৮ সালে মালয়েশিয়াতে নদীর সঙ্গে পরিচয় হয় চাঁদুপরের কচুয়ার সাইফুলের সঙ্গে। ২০১৯ সালে সাইফুলকে বিয়ে করে নদী। ওই বছরেই বিচ্ছেদ ঘটে তাদের। এরমধ্যে একাধিকবার বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়াতে আসা-যাওয়া করে। মালয়েশিয়াতে নিজেই গড়ে তোলে স্কর্ট সার্ভিস।

এরমধ্যে প্রায় তিন বছর দুবাইয়ে ছিল নদী। একপর্যায়ে বাণিজ্যের জন্য বেছে নেয় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতকে। গত বছরের অক্টোবরে আরও দুই তরুণীকে সঙ্গে নিয়ে ভারতে যায় নদী। বোনপোল হয়ে কলকাতা, পরে বিমানে দমদম হয়ে বেঙ্গালুরুতে। সেখানে তাসলিমা বিউটির মিনি পতিতালয়ে আশ্রয় নেয় তারা। বিউটির মেয়ে প্রীতি এবং অমিত মূলত দালাল। তাদের মাধ্যমে স্কর্ট সার্ভিস দিতো বিউটি। কলকাতা, চেন্নাই, কেরালা বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে এই চক্রের ফ্ল্যাট। সেখানেই অনৈতিক বাণিজ্য করে চক্র। ফ্ল্যাটগুলো সবুজ, বিউটি ও টিকটক হৃদয়ের নামে ভাড়া নেয়া। তাদের এই গ্যাংয়ে সহজেই অন্যতম লিডারে পরিণত হয় নদী। দেশ থেকে অনেক তরুণীকে মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে ভারতে নিয়ে জোর করে, নির্যাতন চালিয়ে বাধ্য করে অনৈতিক কাজে। এরকম অনেক অভিযোগ নদীর বিরুদ্ধে।

পুৃলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নদী জানিয়েছে, নায়িকা হতে চেয়েছিল। বিয়ের আগে থেকেই এ নিয়ে চেষ্টার কমতি ছিল না। রূপচর্চা করতো নিয়মিত। সুযোগও এসেছিল। প্রথম সারির ৯০ দশকের সাড়া জাগানো এক নায়িকার সঙ্গে চলচ্চিত্রে পার্শ্ব চরিত্রে অভিনয়ও করেছে নদী। তারপরও মূলত অভাব অনটনের কারণেই দেশ ছেড়ে বিদেশে যায়। সেখানে গিয়েই পা দেয় অন্ধকার পথে। টেনে নেয় আরও অনেককে।

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের বাঘবাড়ি গ্রামের বাবুল সরদারের মেয়ে নদী আক্তার ওরফে ইতি। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, তামিল, মালয় ও আরবি ভাষায় দক্ষ নদী। বিভিন্ন নামে পরিচিত এই তরুণী। ভারতীয় আধারকার্ডে তার নাম জয়া আক্তার জান্নাত, পাসপোর্টে নূরজাহান, সাতক্ষীরার দালালদের কাছে জলি, যশোরে প্রীতি, দুবাইয়ে লায়লা নামে পরিচিত। গত ৬ই এপ্রিল ভারত থেকে দেশে আসার পর সম্প্রতি হাতিরঝিল থানা পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হয় নদী।

তেজগাঁও বিভাগের পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. হাফিজ আল ফারুক বলেন, নদীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা গেছে তার কাছ থেকে। নদীসহ সাতজনকে গ্রেপ্তারের পর গত মঙ্গলবার তাদের চারদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। সুত্র: মানবজমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *