সেই ভারতই এখন বাংলাদেশের বড় শত্রু !

করোনাভাইরাস রূপ পাল্টাচ্ছে একের পর এক। বিজ্ঞানীরা যখন এ ভাইরাসের মোকাবিলায় হরেক রকমের ওষুধ ও টিকা তৈরিতে অহর্নিশ পরিশ্রম করে চলেছেন, ভাইরাসটিও নিত্য নতুন রূপে আবির্ভূত হয়ে তাঁদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে যাচ্ছে।

ভাইরাস জগতে রূপ পাল্টানো নতুন কোনো বিষয় নয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে মিউটেশন। করোনাভাইরাসের আবির্ভাবের পর বিগত বছর দেড়েকের মধ্যে এ ভাইরাসের শুধু স্পাইক প্রোটিনেই ৪ হাজারের অধিক মিউটেশন ঘটেছে। কিন্তু, মিউটেশনে সৃষ্ট এসব ভ্যারিয়েন্টের বেশিরভাগই সংক্রমণের বিভিন্ন আঙ্গিকের নিরিখে বিশেষ কোনো গুরুত্ব বহন করে না।

একটি ভেরিয়েন্ট কেবল তখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে, যখন দেখা যায় যে, এটি মূল ভাইরাসের চেয়ে অধিকতর সংক্রামক, অপেক্ষাকৃত গুরুতর অসুস্থতা সৃষ্টি করে, দ্রুততর গতিতে ছড়ায় কিংবা ইতোপূর্বেকার ইনফেকশন বা টিকা গ্রহণের মধ্য দিয়ে অর্জিত ইমিউনিটিকে এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়। করোনাভাইরাসের এ রকম কিছু ভেরিয়েন্ট বিশ্বের বিভিন্ন

অঞ্চলে নতুন করে সংক্রমণ বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে। এযাবৎ বিজ্ঞানীরা এ ধরনের চারটি ভেরিয়েন্ট চিহ্নিত করেছেন, যথা – ইউকে ভেরিয়েন্ট (বি.১.১.৭., ব্রাজিলিয়ান ভেরিয়েন্ট (পি.১., সাউথ আফ্রিকান ভেরিয়েন্ট (বি.১.৩৫১. এবং ক্যালিফোর্নিয়ান ভেরিয়েন্ট (বি.১.৪২৯.। এই ভেরিয়েন্টগুলোকে ভেরিয়েন্ট অব কনসার্ন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। এ তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন হতে পারে সাম্প্রতিককালে ইন্ডিয়ায় আবির্ভূত নতুন ভেরিয়েন্ট -ইন্ডিয়ান ভেরিয়েন্ট,

বি.১.৬১৭। তবে, এই ভেরিয়েন্টটি Bangladesh Pratidinআপাত দৃষ্টিতে উদ্বেগজনক বিবেচিত হলেও যেহেতু সংক্রমণের বিভিন্ন আঙ্গিকে এটির অবস্থান এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি, এটাকে এখনো ভেরিয়েন্ট অব ইন্টারেস্ট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ডের মতো রেগুলেটরি বডি এটাকে একটি মাঝামাঝি অবস্থানে রেখে

‘ভেরিয়েন্ট আন্ডার ইনভেস্টিগেশন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। (What do we know about the Indian coronavirus variant?| Coronavirus, The Guardian, April 19, 2021. সম্প্রতি পাশের দেশ ভারতে করোনা অতিমারী ভয়াবহ আকার ধারণ করে। গত বছর দৈনিক করোনা সংক্রমণের সংখ্যা সর্বোচ্চ প্রায় ১ লাখ এবং মৃতের সংখ্যা প্রায় ১ হাজারে উঠার

পর সেপ্টেম্বর থেকে কমতে শুরু করে এবং এ বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নাগাদ তা যথাক্রমে প্রায় ১০ হাজার ও একশ’তে নেমে আসে। কিন্তু, মার্চের শুরু থেকে হঠাৎ সংক্রমণ তীব্র গতিতে উর্ধ্বমুখী হয় এবং সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুসারে দৈনিক সংক্রমণের সংখ্যা ৪ লাখ এবং মৃতের সংখ্যা ৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো।

ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নাগাদ যখন সংক্রমণ এযাবৎকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে, অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, হয়তোবা অতিমারীর সবচেয়ে খারাপ সময়টা কেটে গেছে। ডিসেম্বর-জানুয়ারি সময়কালে চেন্নাইয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এপিডেমায়োলজি পরিচালিত একটি অ্যান্টিবডি সমীক্ষা প্রাক্কলন করে, ভারতের বড় বড় শহরগুলোর

কিছু এলাকায় ৫০ শতাংশেরও বেশি লোক এবং জাতীয়ভাবে ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ইতোমধ্যে সংক্রমিত হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, জনসাধারণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সংক্রমণের মাধ্যমে কিছুটা ইমিউনিটি অর্জন করেছে। এ প্রেক্ষিতে কিছু গবেষক এমনটাই প্রত্যাশা করছিলেন যে, অতিমারির পরবর্তী ধাপটির তীব্রতা অপেক্ষাকৃত কম হবে-

বলেন দিল্লিতে কর্মরত নিউজার্সি প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির এপিডেমায়োলজিস্ট রমন লক্ষ্মীনারায়ণ। (India’s massive COVID surge puzzles scientists| nature, April 21, 2021.. কিন্তু, বাস্তবে ঘটল ঠিক উল্টোটা। প্রশ্ন হলো, কেন হঠাৎ সংক্রমণ ফের এরূপ উল্কাবেগে ঊর্ধ্বমূখী হলো? কী হতে পারে এর অন্তর্নিহিত কারণ? সংক্রমণ কমে

আসা ও টিকা দান কার্যক্রম শুরু হওয়ায় আত্মতুষ্টি বশে স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে লোকজনের অবাধে মেলামেশা ও ঘোরাফেরা? নাকি অধিকতর সংক্রামক নতুন কোনো ভেরিয়েন্টের আগমন/আবির্ভাব? ঠিক কোন ফ্যাক্টরটি এখানে প্রধান ভূমিকা

রেখেছে তা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনো পরিষ্কার নয়। তবে, বিশেষজ্ঞ মহলের কাছে সম্প্রতি ভারতে দেখা দেওয়া নতুন ভেরিয়েন্ট, বি.১.৬১৭, যা ইতোমধ্যে ‘ডাবল মিউট্যান্ট’ হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছে, তা বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

এই ভেরিয়েন্টটির বিশেষত্ব হলো : এর স্পাইক প্রোটিনে এমন দুটি গুরুত্বপূর্ণ মিউটেশনের সমন্বয় ঘটেছে, যেগুলো আগে আবিষ্কৃত মারাত্মক ভেরিয়েন্টসমূহে কোনো না কোনোটিতে স্বতন্ত্রভাবে দেখা গেলেও কোনো ভেরিয়েন্টেই একসঙ্গে দেখা যায়নি।

এটিই এর ‘ডাবল মিউট্যান্ট’ নামের ভিত্তি। এর মানে নিশ্চয়ই এই নয় যে, এতে কেবল দু’টো মিউটেশন ঘটেছে, বরং প্রকৃতপক্ষে মোট মিউটেশনের সংখ্যা এক ডজনেরও বেশি। যাই হোক, দুটো মিউটেশনের একটি হচ্ছে E484Q, যার অনুরূপ মিউটেশন (E484K. ইতোপূর্বে সাউথ আফ্রিকান ভেরিয়েন্ট, ব্রাজিলিয়ান ভেরিয়েন্ট এবং ইউকে

ভেরিয়েন্টের কিছু স্ট্রেইনেও পরিলক্ষিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের মিউটেশন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে পূর্বের সংক্রমণ বা টিকা গ্রহণের ফলে তৈরি অ্যান্টিবডির কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। দ্বিতীয় মিউটেশনটি হলো L452R, যা ইতোপূর্বে ক্যালিফোর্নিয়ান ভেরিয়েন্টে দেখা গেছে। ভারতের সিএসআইআর-আইজিআইবি-এর পরিচালক ড. অনুরাগ আগ্রাওয়ালের মতে,

এটি করোনাভাইরাসের সংক্রম্যতা প্রায় ২০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়; বিপরীতে অ্যান্টিবডির কার্যকারিতা ৫০ শতাংশেরও অধিক কমিয়ে দেয়। (Is a double mutant COVID variant behind India’s record surge? Al Jazeera, April 19, 2021, সুতরাং, এটি স্পষ্ট যে, এ দুটি মিউটেশনের যুগপৎ উপস্থিতি ভাইরাসটিকে অধিকতর

সংক্রামক করে তুলে এবং এটি টিকা বা পূর্ববর্তী সংক্রমণের ফলে তৈরি অ্যান্টিভাইরাল অ্যান্টিবডির আক্রমণ পাশ কাটিয়ে যেতে সক্ষম হতে পারে। কাজেই, তাত্ত্বিক বিচারে এই ভেরিয়েন্টটিকে একটি ‘ভেরিয়েন্ট অব কনসার্ন’ হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। [চলবে]লেখক : অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, জাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *