ভাইরাল অডিও ক্লিপ কি মুনিয়া-আনভীরের?

রাজধানীর গুলশানে একটি ফ্ল্যাট থেকে মোসারাত জাহান মুনিয়া নামের এক তরুণীর ঝু”ল”ন্ত ম’রদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এখনো কোনো কূল-কিনারা হয়নি। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে। ভাইরাল অডিও ক্লিপটিতে, এক ব্যক্তি ও এক নারীর কথোপকথন শোনা যায়। সেই কথোপকথনে ৫০ লাখ টাকার কথা উঠে আসে। তবে এই টাকার উৎস নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠছে।

অডিও ক্লিপে ওই ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, আমার টাকাটা দিয়া দিস, তুই-ই আমার টাকা নিছস। কান্নারত তরুণী বলেন, আল্লাহরে ভয় পান না আপনি? আপনাকে কে বলছে আমি ৫০ লাখ টাকা নিছি, আমি কোনো টাকা নেই নাই। উত্তরে অন্যপাশ থেকে ওই তরুণীকে বারংবার অকথ্য ভাষায় গা”লা”গা”লি করা হয়। যদিও অডিও ক্লিপটিতে কথা বলা দুইজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে অডিও ক্লিপটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে।

পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী গণমাধ্যমকে জানান, দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরের সঙ্গে মোসারাত জাহানের পরিচয় ছিল। ওই ফ্ল্যাটে তার যাতায়াতের বিষয়েও তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ভাইরাল হওয়া অডিও ক্লিপটি মুনিয়া ও আনভীরের কি না সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে মুনিয়ার বড় বোনের অভিযোগ, ভিকটিমের সঙ্গে আনভীরের দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিচয় এবং সম্পর্ক। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে মনমালিন্য ঘটে। পরবর্তীতে মুনিয়া কুমিল্লা চলে যান। পরে কুমিল্লা থেকে পুনরায় ঢাকায় আসেন। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তীতে মুনিয়া তার বোনকে ফোন করে জানান, তার জীবনে যেকোনো সময় যে কোনো কিছু ঘটতে পারে।

সুদীপ আরো জানান, যদি সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় যে, অভিযুক্ত দোষী তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে যে ব্যবস্থা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ চলছে বলেও জানান তিনি।

মামলার তদন্ত নিয়ে বলেন, আমরা মামলাটিকে সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। থানার যে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তিনিই এই তদন্তের ভার নিয়েছেন। সুষ্ঠু তদন্তের জন্য যে পদক্ষেপ নেয়া দরকার সেটাই করা হবে।

এদিকে, আ”ত্মহ”ত্যা”র প্ররোচনার অভিযোগে মুনিয়ার বড় বোন মামলায় বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরকে আসামি করে মামলা করেছেন।

মামলার এজাহারে বলা হয়, মোসারাত জাহান (২১) মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী। দুই বছর আগে মামলার আসামি সায়েম সোবহান আনভীরের (৪২) সঙ্গে মোসারাতের পরিচয় হয়। পরিচয়ের পর থেকে তারা বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় দেখা করতেন এবং সব সময় মোবাইলে কথা বলতেন। এক পর্যায়ে দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

২০১৯ সালে মোসারাতকে স্ত্রী পরিচয় দিয়ে আসামি রাজধানীর বনানীতে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। সেখানে তারা বসবাস করতে শুরু করেন। ২০২০ সালে আসামির পরিবার এক নারীর মাধ্যমে এই প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পারে। এরপর আসামির মা মোসারাতকে ডেকে ভয়ভীতি দেখান এবং তাকে ঢাকা থেকে চলে যেতে বলেন। আসামি কৌশলে তার (বাদী নুসরাতের) বোনকে কুমিল্লায় পাঠিয়ে দেন এবং পরে বিয়ে করবেন বলে আশ্বাস দেন।

সর্বশেষ গত ১ মার্চ মোসারাতকে প্ররোচিত করেন আসামি। তিনি বাসা ভাড়া নিতে বাদী নুসরাত ও তার স্বামীর পরিচয়পত্র নেন। ফুসলিয়ে তিনি মোসারাতকে ঢাকায় আনেন। তিনি গুলশানের ১২০ নম্বর সড়কে বাসা (ফ্ল্যাট-বি-৩) ভাড়া নেন। ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে আসামি ও তার (বাদীর) বোনের স্বামী-স্ত্রীর মতো ছবি তুলে তা বাঁধিয়ে রাখা হয়। আসামি বাসায় এলে কক্ষটি পরিপাটি করে রাখা হতো। বোনের মাধ্যমে মামলার বাদী জানতে পারেন, আসামি তাকে বিয়ে করে বিদেশে স্থায়ী হবেন। কারণ, দেশে থাকলে আসামির মা–বাবা আসামিকে কিছু না করলেও তার বোনকে মেরে ফেলবেন। গত ১ মার্চ থেকে আসামি মাঝেমধ্যে ফ্ল্যাটে আসা-যাওয়া করতেন।

বাদী এজাহারে আরো বলেন, ২৩ এপ্রিল মোসারাত তাকে ফোন করেন। মোসারাত তাকে বলেছেন, আনভীর তাকে বকা দিয়ে বলেছেন, কেন তিনি (মোসারাত) ফ্ল্যাটের মালিকের বাসায় গিয়ে ইফতার করেছেন, ছবি তুলেছেন। ফ্ল্যাটের মালিকের স্ত্রী ফেসবুকে ছবি পোস্ট করেছেন। এ ছবি ‌পিয়াসা দেখেছেন। পিয়াসা মালিকের স্ত্রীর ফেসবুক বন্ধু। এখন পিয়াসা তার মাকে সবকিছু জানিয়ে দেবেন। তিনি (আসামি) দুবাই যাচ্ছেন, মোসারাত যেন কুমিল্লায় চলে যান। আসামির মা জানতে পারলে তাকে (মোসারাত) মেরে ফেলবেন।

দুদিন পর ২৫ এপ্রিল মোসারাত তাকে ফোন করেন। ওই সময় তিনি কান্নাকাটি করে বলেন, আনভীর তাকে বিয়ে করবেন না, শুধু ভো’গ করেছেন। আসামিকে উদ্ধৃত করে মোসারাত বলেন, আসামি তাকে বলেছেন, তিনি (মোসারাত) তার শত্রুর সঙ্গে দেখা করেছেন। মোসারাতকে তিনি ছাড়বেন না।

মোসারাত চিৎকার করে বলেন, আসামি তাকে ধোঁ’কা দিয়েছেন। যেকোনো সময় তার বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তারা (বাদী নুসরাতের পরিবার) যেন দ্রুত ঢাকায় আসেন। নুসরাত তার আত্মীয়স্বজন নিয়ে বেলা দুইটার দিকে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় রওনা দেন। আসার পথে বারবার মোসারাতের ফোনে ফোন করেন কিন্তু তিনি আর ফোন ধরেননি। গুলশানের বাসায় পৌঁছে দরজায় নক করলে ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে নিচে নেমে আসেন। তারা নিরাপত্তারক্ষীর কক্ষ থেকে বাসার ইন্টারকমে ফোন করেন। পরে ফ্ল্যাটের মালিকের নম্বরে ফোন দিলে মিস্ত্রি এনে তালা ভে”ঙে ঘরে ঢোকার পরামর্শ দেন। মিস্ত্রি ডেকে তালা ভে”ঙে ভেতরে ঢো’কা’র পর তিনি দেখেন, তার বোন ও”ড়”না পেঁ”চি”য়ে শোয়ার ঘরের সিলিংয়ে ঝু”লে আছেন।

এজাহারে আরো উল্লেখ করা হয়, পুলিশ এসে ও”ড়”না কে”টে মোসারাতের মৃতদেহ নামায়। আলামত হিসেবে আসামির সঙ্গে ছবি, আসামির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে লেখা ডায়েরি ও তার ব্যবহৃত দুটি মুঠোফোন নিয়ে যায় পুলিশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *