বিএনপির বৃহত্তর ঐক্যের উদ্যোগে ‘বাধা’ জামায়াত

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগবিরোধী সব রাজনৈতিক দলকে একত্রে চায় বিএনপি। এজন্য বাম-ডানসহ সব দলকে নিয়ে ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’ গড়তে তৎপর দলটি।

জাতীয় নির্বাচনের আড়াই বছরের বেশি সময় বাকি থাকতে একসঙ্গে আন্দোলন, সংসদ ভেঙে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীন নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশনের আমূল সংস্কার আনাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

ইতোমধ্যে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগও শুরু হয়েছে। অধিকাংশ দলই জামায়াতে ইসলামীকে ছাড়ার শর্তে ঐক্যে যেতে রাজি বলে জানিয়েছে। ফলে নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নে জামায়াতকে বাধা মনে

করছে বিএনপি। বৃহত্তর জোট গঠনের আগে জামায়াত ছাড়ার ব্যাপারে বিএনপির পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। দলের একাধিক নীতিনির্ধারকের কাছ থেকে জানা গেছে এসব তথ্য।

জানা গেছে, বিএনপির তিনজন সিনিয়র নেতাকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে অন্তত ১২ জন সাবেক ছাত্রনেতাও কাজ করছেন। দলের শুভাকাঙ্ক্ষী বুদ্ধিজীবীদের

সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। তারা বাম দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করছেন। নতুন এ উদ্যোগে আসার জন্য ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশসহ আরও কয়েকটি ইসলামি দলের সঙ্গেও কথা বলবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। আমরা সবার সঙ্গেই কথা বলছি। ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলো এবং এর বাইরে যেসব দল আছে তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলছি।

বিএনপির সঙ্গে থাকা দুই জোটকে স্বতন্ত্র রেখে, নাকি একসঙ্গে সব দল মিলে বৃহত্তর ঐক্যে হবে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা এখনই বলা যাবে না। এটা নির্ধারিত হবে সবার সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে।জামায়াত প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব বলেন, জামায়াত ২০ দলীয় জোটে আছে। তাদের ব্যাপারে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে যারা শর্ত দিয়েছেন তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আসলে জামায়াত ২০ দলীয় ঐক্যজোটে আছে ঠিকই;

কিন্তু দীর্ঘদিন তাদের সঙ্গে বিএনপির কোনো প্রোগ্রাম হচ্ছে না। তারা তাদের মতো করছে, আমরা আমাদের মতো। সুতরাং জামায়াতের বিষয়টা কোনো ফ্যাক্টর বলে আমি মনে করি না। আলোচনার মাধ্যমে জামায়াতের বিষয়ে সুরাহা হবে।তিনি মনে করেন, বর্তমান অবস্থায় কে আসে, কে না-আসে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বর্তমান সরকার থেকে দেশকে মুক্ত করা।

জানতে চাইলে বাম গণতান্ত্রিক জোটের সাবেক সমন্বয়ক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক যুগান্তরকে বলেন, আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ এখনো হয়নি। তারা (বিএনপি) কথা বলতে চাইলে নিশ্চয়ই বলব। চিহ্নিত জঙ্গিবাদী বা মৌলবাদী এসব দল ছাড়া বাকি গণতান্ত্রিক দলগুলোর মধ্যে নিশ্চয়ই আন্দোলনের ঐক্য গড়ে তোলা দরকার।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, বহু আগেই বিএনপিকে বলছি জামায়াতকে বাদ দিয়ে আসুন। আসলে বিএনপি কাজ না-করতে করতে সাহস হারিয়ে ফেলেছে। তাদের একটা ধারণা জন্মেছে-আমরা কি পারব।

তাই জামায়াতকে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। জামায়াতের সঙ্গ ছাড়লে বৃহত্তর ঐক্য গঠন বিএনপির জন্য খুব সহজ হবে। সেক্ষেত্রে বিএনপি নেতাদের মনটাকেও একটু বড় করা দরকার। আমি বড় দল এই অহমিকা ত্যাগ করতে হবে। তাদের সব দলকে সম্মান দিয়ে একত্রে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে।

দলের নির্ভরযোগ্য সূত্র বলেছে, নতুন এ উদ্যোগ সফল হলেই আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা আসবে। তবে সেক্ষেত্রে ২০ দলীয় জোটকে স্বতন্ত্র রাখা হবে নাকি ‘বৃহত্তর ঐক্যে’ থাকবে সেটি এখনো পরিষ্কার নয়।

জানা গেছে, গত জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে বিএনপির হাইকমান্ডের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতাদের বিভিন্ন বৈঠকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে আলোচনা হয়। এতে নেতারা ঐক্যফ্রন্ট গঠনকে ভালো সিদ্ধান্ত বললেও পরবর্তী

সময়ে জোটের কর্মকাণ্ড ‘বিতর্কিত’ ছিল বলে মত দেন। এ ছাড়া গত ১৬ এপ্রিল থেকে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক ভার্চুয়ালি বৈঠক করছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

সেখানে উপদেষ্টা ও ভাইস চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠকে নেতারা এই ফ্রন্ট ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দেন। অধিকাংশ নেতাই বৈঠকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সর্বাত্মক আন্দোলনের বিকল্প নেই।

এর জন্য ডান-বাম সবাইকে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়তে হবে। কিন্তু সেই ঐক্যে এমন কাউকে রাখা যাবে না, যারা জিয়াউর রহমানের নাম উচ্চারণ করতে চায় না। তবে তারেক রহমানসহ বেশিরভাগ নেতা ঐক্যের জায়গায় ডান-বাম সবাইকে নিয়ে করার পক্ষে মত দেন।

বিএনপির দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, দলীয় নেতাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে চায় দল। সমালোচনা বিষয় নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। শরিকরা অন্য নামে বিরোধী সব দলকে নিয়ে বিকল্প কোনো উদ্যোগ নিলে সেখানেও তারা থাকবেন বলে বিএনপিকে জানিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা হয়েছিল গত জাতীয় নির্বাচনের আগে। এখন তো ঐক্যফ্রন্টের কাজ করার সেই সুযোগ নেই। মাঝেমধ্যে বিবৃতি পাঠানো হয়। সেজন্য যা কাজ করার তা আমাদের দলের পক্ষ থেকেই করছি। এটা আমাদের একটা কৌশল। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আরও বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার জন্য আমরা একসঙ্গে কাজ করছি।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক দল নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না যুগান্তরকে বলেন, বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়ে আমার সঙ্গে এখনো কথা বলেনি বিএনপি। তবে তারা উদ্যোগ নিলে আমার দল সেখানে থাকবে। আর বৃহত্তর ঐক্য হলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট রাখার প্রয়োজন নেই বলেও মনে করেন তিনি।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের একটি প্রস্তাব বা রূপরেখা ইতোমধ্যে তৈরি করেছে বিএনপি। প্রস্তাবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে একসঙ্গে আন্দোলন, সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীন নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশনের আমূল সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। এখন এ নিয়ে বিরোধী সব দলের সঙ্গে আলোচনা করবে। সবার মতামতের ভিত্তিতে বিএনপির প্রস্তাব বা রূপরেখা সংযোজন-বিয়োজন করে তা চূড়ান্ত করা হবে।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *