আইসিইউর জন্য কাকুতি- মিনতি, ফিরতে হলো নেত্রকোনায়

পিয়াস সরকার: ছবিনেত্রকোনা থেকে করোনা আক্রান্ত আমেনা বেগমকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন তার স্বজনরা। করোনায় তার শ্বাসকষ্ট হওয়ায় স্থানীয় চিকিৎসকরা আইসিইউতে ভর্তির পরামর্শ দেন। নেত্রকোনায় আইসিইউ না থাকায় তাকে নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। সোমবার ভোরে ঢাকা পৌঁছানোর পর একে একে ছয়টি সরকারি হাসপাতালে এম্বুলেন্স ছুটে যায় আমেনা বেগমকে নিয়ে। স্বজনরা একটি আইসিইউ বেডের জন্য কাকুতি- মিনতি করেন। কিন্তু কোথাও সিট মেলেনি। কোনো উপায় না হওয়ায় বিকালে একই এম্বুলেন্সে করে আমেনা বেগমকে নিয়ে যাওয়া হয় নেত্রকোনায়। তার স্বজনরা জানিয়েছেন, আশা নিয়ে ঢাকা এসেছিলেন।

এখানে আইসিইউ না পাওয়ায় নেত্রকোনা সদর হাসপাতালের সাধারণ বেডেই আমেনা বেগমকে ভর্তি করা হবে। বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসা করানোর মতো সামর্থ্য তাদের নেই।

আমেনা বেগমের ছেলে আজিজুল ইসলাম জানান, তার মায়ের তীব্র ডায়াবেটিস। জটিলতার কারণে স্থানীয় চিকিৎসকরা তাকে ঢাকায় রেফার করেন।

গতকাল বেলা দুইটার দিকে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাইরে একটি এম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আজিজুল ও তার বোন জামাই হাসপাতালে কথা বলছিলেন। এম্বুলেন্সে থাকা মাকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস দিচ্ছিলেন আমেনা বেগমের মেয়ে।

এম্বুলেন্স চালক হাসান আলী পাশেই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি বলেন, নেত্রকোনা থেকে ভোরে রওনা দেই। এরপর রোগী নিয়ে আসি মহাখালীর একটি হাসপাতালে। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল, পিজি, বারডেম ও পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে যাই। কোথাও আইসিইউ সিট না পেয়ে নিয়ে আসি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। এখানে এক ঘণ্টার মতো অপেক্ষা করেছি। কিন্তু সিট পাওয়া যায়নি।

এম্বুলেন্সের ছোট একটি ফ্যান ঘুরছিলো রোগীর মাথার উপর। ঘণ্টাখানেক পর আমেনা বেগমের ছেলে ফিরে এলেন স্ট্রেচারসহ। রোগীকে নামিয়ে নিয়ে গেলেন করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত অভ্যর্থনা কক্ষে। সেখানে কাঁচ ঢাকা ঘরেই রোগীর কাগজপত্র দেখলেন তারা। পরীক্ষা করা হলো অক্সিজেন লেভেল। চিকিৎসকের পরামর্শ মতো আইসিইউ’র প্রয়োজনের কথা জানানো হলো প্রাথমিক পরীক্ষার পর। বলা হলো, কাগজ দিয়ে আইসিইউ’তে যোগাযোগ করতে। হাসপাতালের তিন তলায় কাগজ নিয়ে গেলেন তার স্বজনরা। তা দেখানোর পর বলা হলো, আইসিইউ বেড খালি নেই। আপাতত সাধারণ বেডে রোগীকে ভর্তি করানোর পরামর্শ দেন তারা, পরে আইসিইউ বেড ফাঁকা হলে নেয়া যাবে। পরে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় করোনা ইউনিটে যান আমেনার স্বজনরা। সাধারণ বেডে রোগী ভর্তির সুযোগ আছে বলে জানিয়ে দেয়া হয় তাদের।

পরে করণীয় ঠিক করতে নিজেরা আলোচনা করেন। এরপর সিদ্ধান্ত নেন আইসিইউ যেহেতু মিলছে না তাই রোগীকে রাজধানীতে না রেখে নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাবেন।

আমেনা বেগমের মেয়ের জামাই মো. রাতুল এ প্রতিবেদককে বলেন, সকাল থেকেই মাকে নিয়ে অনেক চেষ্টা করলাম কোনো স্থানেই একটা সিটের ব্যবস্থা করতে পারলাম না। আইসিইউ যেহেতু পেলাম না এখন ঢাকায় রেখে খরচ না বাড়িয়ে নেত্রকোনাতেই চিকিৎসা দেয়া ভালো।

এসময় আমেনা বেগমের ছেলে আজিজুল ইসলাম মোবাইলে কথা বলছিলেন উচ্চ স্বরে। তার কণ্ঠে উৎকণ্ঠা স্পষ্ট। কথা শুনে বোঝা যাচ্ছিল পরামর্শ করছিলেন মাকে ঢাকায় রেখে চিকিৎসা করাবেন নাকি নিয়ে যাবেন এলাকায়। শেষে সিদ্ধান্ত নিলেন নেত্রকোনাতেই নিয়ে যাওয়ার।

আজিজুল ইসলাম বলেন, আমি ছোট ব্যবসায়ী। করোনার সময় ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। চাইলেও মাকে বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ’তে ভর্তি করাতে পারবো না। মায়ের যেহেতু শ্বাস (অক্সিজেন লেভেল) ভালো। তাই আবার নিয়ে যাবো এলাকায়। সেখানেই চিকিৎসার জন্য চেষ্টা করবো।

হাসপাতালের নিচে স্ট্রেচারে বসেই আমেনা বেগম এক স্লাইচ কেক, অল্প জুস ও পানি পান করলেন। এরপর ফের স্ট্রেচারে করে তাকে এম্বুলেন্সে উঠানো হলো। সাইরেন বাজিয়ে এম্বুলেন্স রওনা দিলো নেত্রকোনার উদ্দেশ্যে।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ড এলাকায় অবস্থান করে দেখা যায় আমেনার মতো অনেকে আইসিইউ’র জন্য আসছেন। আমেনার আগে আরো দুই রোগী অপেক্ষমাণ ছিলেন। তবে তাদের সাধারণ শয্যায় স্বাভাবিকভাবেই ভর্তি করা হয়। সুত্র: দৈনিক মানবজমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *