ভারত-বিরোধী অবস্থানে ফিরে যাচ্ছে বিএনপি

নিজেস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা: এ সপ্তাহে বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে দু’জন বাংলাদেশী নিহত হবার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিরোধীদল বিএনপি।

কিন্তু কিছু পরিসংখ্যান অনুযায়ী যখন বিএসএফের গুলিতে সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা কমে গেছে – তখন বিএনপি এ নিয়ে মুখ খুললো কেন? তারা কি নির্বাচনের পর ভারত সম্পর্কে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে- এসব প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

অনেকদিন পর তারা বিএসএফের হাতে বাংলাদেশী নিহত হওয়ার ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে।

দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, দশকের পর দশক ধরে সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যার ধারাবাহিকতা এখনও পর্যন্ত পুরোদমে চলছে।

এজন্য তিনি দেশের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ‘নতজানু পররাষ্ট্র নীতি’ নেয়ার অভিযোগ করেছেন।

তিনি বলেছেন, সরকার সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশীদের হত্যা এবং ধরে নিয়ে নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ পর্যন্ত করেনি।

বিএনপিও দীর্ঘ সময় পর এবিষয়ে মুখ খুললো কেন এই প্রশ্নের জবাবে মি: আলমগীর বিবিসিকে বলেছেন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না এবং তিনি তার নির্বাচনী এলাকা ঠাকুরগাঁয়ে সফরে থাকার সময় ঐ সীমান্তে গত কয়েকদিনে দু’জন বাংলাদেশীকে হত্যা করা হয়েছে, সেজন্য তিনি এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

“এ হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়নি। কেউ যদি অপরাধ করে বেআইনিভাবে ঢুকে পড়ে, তার জন্য আইন আছে। কিন্তু তাকে গুলি করে হত্যা করার বিষয়টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সে কারণেই, এবং যেহেতু আমার জেলা ঠাকুরগাঁয়ে আমি এসেছিলাম, তখন ঘটনাগুলো ঘটেছে। সেকারণে আমি মনে করেছি যে, এ সম্পর্কে আমার একটা বিবৃতি থাকা উচিত। এটা আমার দায়িত্ব,” বলেন মি. আলমগীর।

সরকার সঠিকভাবে বাংলাদেশের স্বার্থগুলোকে প্রতিবেশী বন্ধু দেশের কাছে তুলে ধরছে না এবং এসবের সমাধানও করছে না। যেমন ধরেন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড ছাড়াও তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের সমস্যা আছে, সেই সমস্যাও সমাধান হয়নি। অথচ সরকার দাবি করছে যে, ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন সবচেয়ে ভালো।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে সবচেয়ে বেশি ১৫৫ জন বাংলাদেশী নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল ২০০৬ সালে। পরের বছরও নিহতের সংখ্যা একশ’র বেশি ছিল।

২০১১ সালে কুড়িগ্রামের একটি সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ায় ফেলানী নামের এক কিশোরীর মৃতদেহ ঝুলে থাকার ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। সে সময় এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি বিএনপিও মাঠে নেমে এর প্রতিবাদ জানিয়েছিল।

এরপরেও সীমান্তে বাংলাদেশী নিহত হওয়ার অনেক ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বিএনপি আর সেভাবে সোচ্চার ছিল না।

গত কয়েক বছরে, বিশেষ করে ৩০শে ডিসেম্বরের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের আগে, বিএনপি ভারতের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেছে।

দলটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির একজন সদস্য রুমিন ফারহানা বলছিলেন, সীমান্তে মানুষ হত্যার ঘটনার প্রতিবাদ করা সরকারেরই বেশি দায়িত্ব বলে তারা মনে করেন।

“আমি বলবো যে, ভারত সরি বলেছে, আমরা সেটা মেনে নিয়েছি। কোন রকমের শক্ত প্রতিবাদ করা হয়নি। প্রতিরোধ করাতো অনেক পরের ব্যাপার।”

নির্বাচনের আগে বিএনপি একটা অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেছিল যে তারা ভারত-বিরোধী নয়।

ভারতের সরকার এবং এমনকি দেশটির ক্ষমতাসীন বিজেপির সাথে সম্পর্ক তৈরির লক্ষ্যে বিএনপির কয়েকজন নেতাকে দায়িত্বও দেয়া হয়েছিল।

তারা কয়েকবার ভারত সফরেও গেছেন। কিন্তু ভারতের সাথে তাদের সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর সাথে বিএনপির সম্পর্কের বিষয়টি একটি বড় বাধা হয়েছিল।

বিএনপির নেতাদের অনেকে মনে করেন, ভারতের সাথে সম্পর্ক তৈরির সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

দলের পক্ষ থেকে কৌশল হিসেবে সেই চেষ্টা চালানো হলেও দলটির ভেতরে এবং তাদের ২০ দলীয় জোটে ভারত-বিরোধী মনোভাবের প্রভাব রয়ে গেছে।

এমন মনোভাবের নেতারা তাদের দলকে আবারও ভারত-বিরোধী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন।

কিন্তু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তারা রাজনৈতিক দলের দায়িত্ববোধ থেকে অন্য কোন দেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের স্বার্থকে সবসময়ই প্রাধান্য দিয়েছেন।

“বিষয়টা কোন পুরনো অবস্থান বা নতুন অবস্থান নয়। বিষয়টা হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় যে সমস্যা আছে, সেই সমস্যাগুলোকে তুলে ধরা, জাতীয় দল হিসেবে, বড় দল হিসেবে আমাদের দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি।”

তবে বিএনপি নেতাদের অনেকে এটাও বলেছেন যে, ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখনও তাদের কৌশলে এগুতে হবে।

তারা মনে করেন, দলের ভেতরে এনিয়ে চাপ তৈরি হলেও এখনকার আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে চরম কোন অবস্থান নিলে সেটা তাদের জন্য আরও ক্ষতিকর হতে পারে।